16/04/2026
গল্প: ভালোবাসা আর দায়িত্বের মাঝে
চতুর্থ পর্ব —
দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও ১০–১২ দিন।
সেদিন স্কুলে একটা বিশেষ প্রোগ্রাম ছিল। সময়ের আগেই পৌঁছে গিয়েছিল নীলিমা। ভেবেছিল একটু শান্তভাবে বসবে, সবকিছু গুছিয়ে নেবে… কিন্তু সেখানে গিয়েই তার বুকটা ধক করে উঠল।
আরাবি…
সে তো আগেই এসে দাঁড়িয়ে আছে।
দূর থেকেই চোখে পড়ল তাকে—সেই চেনা চেহারা, শান্ত দৃষ্টি। নীলিমার ভেতরে হঠাৎ করেই অদ্ভুত একটা অস্থিরতা শুরু হলো।
তার সাথে ছিল ৪–৫ জন বান্ধবী। তারা তো আগেই জানত, নীলিমার মনে কী চলছে। তাই আরাবিকে দেখামাত্রই শুরু হলো হাসাহাসি, খোঁচা দেওয়া—
“ওই দেখ, তোর আরাবি!”
নীলিমা লজ্জায় হালকা রেগে গিয়ে বলল,
—“ধুর, চুপ কর তোরা!”
কিন্তু কথার ফাঁকে হঠাৎই তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল—
—“ইশ… যদি একবার কথা বলতে পারতাম ওর সাথে…”
এই কথাটা শুনেই এক বান্ধবী আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না।
দৌড়ে চলে গেল আরাবির দিকে।
—“এই! যাস না!” —নীলিমা থামানোর চেষ্টা করলেও ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আরাবিকে নিয়ে ফিরে এলো।
নীলিমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কাঁপতে লাগল।
এখন… সে কী বলবে?
মজা করে বলা একটা কথা, কিন্তু এখন সেটাই বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
আরাবি এসে শান্তভাবে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল—
—“ডেকেছো, আপু?”
নীলিমা একটু থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল—
—“তুমি… আমাকে চেনো?”
আরাবি হালকা মাথা নেড়ে বলল—
—“হ্যাঁ, চিনি।”
এই ছোট্ট উত্তরে যেন নীলিমার ভেতরে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামলাতে বলল—
—“আসলে… আমার ফ্রেন্ডরা মজা করে তোমাকে ডেকেছে। কিছু মনে কোরো না।”
—“আচ্ছা,” —বলেই আরাবি চলে যাওয়ার অনুমতি চাইল।
নীলিমা মাথা নেড়ে অনুমতি দিল।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে, নিজেকে ঠিকমতো বোঝার সুযোগই পেল না সে।
কিন্তু এবার…
মনে কোথা থেকে যেন একটু সাহস এল।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার ডাক পড়ল। সবাই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে।
হঠাৎ করে নীলিমা পিছন ফিরে দাঁড়াল।
আরাবির হাত থেকে একটা কাগজ নিয়ে নিল—যেটা সে এতক্ষণ ধরে দেখছিল।
—“কবিতা আবৃত্তি করবে?” —চোখে হালকা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল নীলিমা।
আরাবি ছোট্ট করে হেসে বলল—
—“না… গান গাইব।”
নীলিমা কাগজটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আবার ফিরিয়ে দিল।
তারপর সবাই গিয়ে বসল স্কুলের অডিটোরিয়ামে।
এক এক করে সব অনুষ্ঠান শেষ হতে লাগল।
সবশেষে—গান।
নীলিমার নাম আগেই ডাকল।
স্টেজে উঠে সে নিজের মতো করে গান গাইল। কণ্ঠে হালকা কাঁপন থাকলেও, শেষ পর্যন্ত ভালোই হলো।
স্টেজ থেকে নেমে এসে সে আর কারো দিকে তাকাল না।
এবার আরাবির পালা।
সে ধীরে ধীরে মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মাইকটা হাতে নিল।
এই মুহূর্তে—
দু’জন মানুষের হার্টবিট যেন স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি জোরে বাজছে।
নীলিমা ইচ্ছে করেই তাকাল না তার দিকে।
সে চায়নি, আরাবি আবার অপ্রস্তুত হয়ে পড়ুক।
শুধু চুপচাপ বসে শুনতে লাগল তার কণ্ঠ…
আরাবির গলায় এক ধরনের শান্ত সুর ছিল। খুব জোরালো না, আবার একদম মৃদুও না—কিন্তু অদ্ভুতভাবে মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।
“খারাপ না… ভালোই,” —মনে মনে বলল নীলিমা।
অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরে এল সে।
কিন্তু সেদিন রাতটা আর স্বাভাবিক ছিল না।
তার মাথার ভেতর বারবার ভেসে উঠছিল—
আরাবির কণ্ঠ…
সেই গানের সুর…
অজান্তেই কয়েকবার আস্তে আস্তে গুনগুন করে গেয়ে ফেলল সে।
আর ভাবতে লাগল—
সেই ছেলেটার কথা…
যাকে সে এখনো ঠিকমতো চেনে না,
তবুও…
কেন যেন মনে হয়, অনেকদিনের চেনা।
চলবে…
#ভালোবাসাআরদায়িত্বেরমাঝে