22/05/2026
পিস লিলি এমন এক ইনডোর গাছ যা অতি অল্প যত্নেই সন্তুষ্ট। এ গাছের জন্য না লাগে প্রচুর সূর্যের আলো, না লাগে বেশি পানি, না লাগে দামি সার। অথচ পিস লিলি গাছ দেখতে যেমন সুন্দর, কাজেও তেমন উপকারি। সামান্য পরিচর্যাতেই একরাশ ঘন সবুজ পাতা নিয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠে পিস লিলি। আকর্ষণীয় সাদা ফুলের জন্য পিস লিলি গাছকে শান্তির দ্যোতক মনে করা হয়।
পিস লিলির পরিচয় -
সপুষ্পক চিরসবুজ গাছ পিস লিলি। এ গাছের আদিনিবাস ছিলো সুদূর আমেরিকার নিরক্ষীয় বৃষ্টিবন। স্বভাবতই সেখানকার মতো উষ্ণ, আর্দ্র, আলোছায়া যুক্ত পরিবেশ এ গাছের বড়ো প্রিয়। বাড়িতে রাখতে চাইলে পিস লিলি গাছকে এরকম পরিবেশই দিতে হবে। সাধারণত আমাদের দেশের জলবায়ুতে এ গাছ ভালোভাবেই বেঁচে থাকে। ঠিকমতো বাড়লে টবের পিস লিলি গাছ ১৬ থেকে ২৪ ইঞ্চি উঁচু হয়।
নামটা পিস লিলি হলেও এ গাছ সত্যি সত্যি লিলি জাতীয় গাছ নয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Spathiphyllum। স্প্যাথিফাইলাম আসলে উদ্ভিদরাজ্যের একটা গণ। এই গণের অন্তর্গত প্রায় ৫০ প্রজাতির পিস লিলি গাছ পৃথিবীতে দেখা যায়। প্রতিটা প্রজাতির মধ্যে আবার নানান ভ্যারাইটি আছে। পিস লিলির বেশ কিছু ভ্যারাইটি ইনডোর গাছ হিসেবে সারা বিশ্বে দারুণ জনপ্রিয়।
গাছের সৌন্দর্য -
পিস লিলি গাছের সৌন্দর্যের উৎস হলো একরাশ ঘন সবুজ পাতা ও উজ্জ্বল সাদা ফুল। পাতাগুলো ৩-২৫ সেমি চওড়া এবং ১২-৬৫ সেমি লম্বা হয়। পিস লিলির ফুল উজ্জ্বল সাদা বা সাদাটে রঙের। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা সাদা পতাকার মতো। এই ফুলগুলোর জন্য পিস লিলি গাছকে শান্তির প্রতীক রূপে গণ্য করা হয়। সারা বছর পিস লিলির ফুল ফুটতে পারে। ফুল ফুটলে তা থেকে একরকম মৃদু সুগন্ধ পাওয়া যায়।
এখানে একটা কথা আছে। পিস লিলির ফুল বলতে যেটাকে বোঝানো হয় সেটা আসলে ফুল নয়। সেটা আসলে ফুলকে ঘিরে থাকা ঢাকনার মতো এক ধরণের পরিবর্তিত পাতা। পিস লিলির আসল ফুলগুলো ছোটো ছোটো, একটা ডাঁটির ওপর ফোটে। ঐ ডাঁটিকে ঘিরে থাকা সাদা বা সাদাটে রঙের পরিবর্তিত পাতাকেই আমরা সাধারণত পিস লিলির ফুল বলে থাকি।
পিস লিলির উপকারিতা -
পিস লিলি ঘর সাজানোর জন্য খুব সুন্দর গাছ। এই গাছের একটা বড়ো সুবিধা হলো এর জন্য বেশি যত্ন লাগে না। এই গাছ বায়ু শোধনেও দারুণ কার্যকর। আমাদের দেশের জলবায়ুর পক্ষে উপযোগি সেরা বায়ুশোধক ইনডোর গাছগুলো বেছে নিতে বললে তার মধ্যে পিস লিলিকে অবশ্যই রাখতে হবে। এই গাছ এক রাশ চওড়া পাতার সাহায্যে ঘরের বাতাস থেকে নানারকম ক্ষতিকর উদ্বায়ি যৌগ শোষণ করে নেয়। যেমন,
ফরম্যালডিহাইড,
বেনজিন,
জাইলিন,
ট্রাইক্লোরোইথেন,
টলুইন, ইত্যাদি।
পিস লিলি গাছের যত্ন
সাধারণত পিস লিলির বংশবিস্তার রাইজোমের সাহায্যে করা হয়। গাছের গোড়ার দিক থেকে পিস লিলির নতুন চারা বেরোয়। এই চারা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে অন্য জায়গায় পুঁতে দিলে নতুন গাছ তৈরি হয়। এছাড়া বীজ থেকেও পিস লিলির বংশবিস্তার করা যায়। পিস লিলি গাছের যত্নের নিয়মগুলো সহজ। এক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় মনে রাখতে হবে।
➤ ভালো পানি নিকাশি ব্যবস্থা যুক্ত দোয়াঁশ বা বেলে-দোয়াঁশ মাটি পিস লিলি গাছের পক্ষে সবচেয়ে ভালো। এঁটেল মাটি এ গাছের জন্য ভালো নয়।
➤ পিস লিলি গাছের মাটি তৈরির সময় কিছুটা জৈব সার মেশানো যেতে পারে। এছাড়া এ গাছে ঘন ঘন সার দেওয়ার দরকার হয় না। পিস লিলি গাছে কোনো রকম রাসায়নিক সার লাগে না।
➤ পিস লিলি গাছের যত্নে পানিসেচ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পিস লিলি শুকনো মাটি ভালোবাসে না। আবার বেশি পানিতেও পিস লিলির গোড়া পচে গাছ মরে যেতে পারে। তাই এই গাছে সর্বদা পরিমিত পানি দেওয়া উচিত। সাধারণত সপ্তাহে দুবার পানি দিলেই টবের পিস লিলির পক্ষে যথেষ্ট। তবে পিস লিলি গাছে ধরাবাঁধা রুটিনে পানি দেওয়ার চেয়ে গাছের মাটি দেখে জল দেওয়া ভালো।
➤ ট্যাপের জলে ক্লোরিন বা ফ্লুওরিন থাকলে সেই পানি পিস লিলি গাছে দেওয়া ঠিক নয়। দিলে পাতা হলুদ হয়ে গাছ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যদি একান্তই এ ধরনের ট্যাপের পানি পিস লিলি গাছে দিতে হয়, তবে তা অন্তত একদিন আগে বালতিতে তুলে রেখে, ওপরের দিক থেকে দিতে হবে।
➤ পিস লিলির পাতা বাতাসের ভাসমান ধুলো আকর্ষণ করে। তাই পাতাগুলোকে মাঝেমধ্যে স্প্রেয়ার দিয়ে বা পানি ছিটিয়ে ধুয়ে দেওয়া ভালো। তাতে পাতাগুলো তরতাজা থাকবে ও ঝকঝকে দেখাবে। পিস লিলি গাছ বেশি আর্দ্রতা ভালোবাসে। তাই একটা পানির ট্রের ওপর পিস লিলির টব রাখতে পারলে আরো ভালো।
➤ পিস লিলি ছায়ার গাছ। এই গাছ সরাসরি রোদে রাখা চলবে না। পরোক্ষ সূর্যালোক ও কৃত্তিম আলোই পিস লিলির জন্য যথেষ্ট। তা বলে আবার একে একেবারে অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় ফেলে রাখাও ঠিক নয়। সেক্ষেত্রে গাছের বাড় ব্যাহত হবে ও ফুল ফুটবে না।
➤ পিস লিলি গাছ বেশি ঝাঁকড়া হয়ে গেলে প্রুনিং বা ছাঁটাই করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে ফুল ফুটে শুকিয়ে যাওয়ার পর গাছের ঐ কান্ডটা কেটে দেওয়া যেতে পারে। পিস লিলির একটা কান্ডে একটাই ফুল ফোটে, ফুল ফুটে শুকিয়ে গেলে ওটা আর ভালো দেখায় না।
➤ পিস লিলি গাছে রোগপোকার আক্রমণ কমই দেখা যায়। এ গাছকে উপযুক্ত মাটি, দরকার মতো জল ও আলো সহ সঠিক পরিবেশ দিতে পারলে এমনিতেই এর স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
➤ পিস লিলি গাছের পাতা বাদামি হয়ে শুকিয়ে গেলে বুঝতে হবে গাছ দরকার মতো জল পাচ্ছে না অথবা খুব শুষ্ক পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে অথবা গাছে রোদের তাত বেশি লাগছে। রোগের কারণ বুঝে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে গাছ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।
➤ অনেক দিন হয়ে যাওয়ার পরেও পিস লিলি গাছ ঠিকঠাক না বাড়লে বা তাতে ফুল না ফুটলে বুঝতে হবে গাছ দরকারের চেয়ে আলো কম পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে টবের অবস্থান বদলে পিস লিলি গাছকে আরেকটু বেশি আলো দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
➤ পিস লিলি গাছে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ সাধারণত দেখা যায়না। তবু যদি কখনো এ ধরণের রোগ হয়, রোগ মোকাবিলায় রাসায়নিক বিষ প্রয়োগ করার চেয়ে জৈব পদ্ধতি অবলম্বন করা ভালো। রোগ একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরতে পারলে, আক্রান্ত অংশ কেটে বাদ দিয়ে রোগের বিস্তার থেকে গাছকে বাঁচানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
➤ পিস লিলি গাছে স্কেল, মিলি বাগ বা অ্যাফিড জাতীয় পোকামাকড়ের আক্রমণ ঘটলে আক্রান্ত গাছটাকে প্রথমেই অন্যান্য গাছ থেকে আলাদা করে ফেলতে হবে। আক্রান্ত অংশ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা যেতে পারে। নিম তেল প্রয়োগ করেও সুফল পাওয়া যাবে। আরেকটা পদ্ধতি হলো রাবিং অ্যালকোহল (আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল)-এ তুলো ভিজিয়ে আক্রান্ত অংশটা সাবধানে মুছে পরিষ্কার করে ফেলা। রাবিং অ্যালকোহল ওষুধের দোকানে কিনতে পাওয়া যায়।
➤ টবে পিস লিলি গাছ রাখলে বছরে একবার টব ও মাটি বদলে দিতে হবে। বদলানোর সময় পিস লিলির নতুন টব পুরোনো টবের চেয়ে একটু বড়ো হওয়া দরকার। গাছের ঝাড় যদি খুব ঝাঁকড়া হয়ে যায়, এই সময় সেটাকে ভাগ করে আলাদা আলাদা টবেও লাগানো যেতে পারে।
একটা ছোট্টো সাবধানতান -
ঘরে পিস লিলি গাছ রাখলে একটা বিষয়ে একটু সাবধান থাকা দরকার। এই গাছের কান্ডে ও পাতায় ক্যালসিয়াম অক্সালেট থাকে। এগুলো খেয়ে ফেললে মুখে ও গলায় অস্বস্তি হতে পারে। তাই বাড়িতে ছোটো বাচ্চা ও পোষ্য থাকলে পিস লিলি গাছের টব তাদের নাগালের বাইরে একটু বেশি উচ্চতায় রাখা ভালো।