21/11/2025
বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঝুঁকি ও ভূমিকম্প-সহনীয় বিল্ডিং ডিজাইন:
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে একটি সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও মধুপুর ফল্ট-জোনের আশপাশের এলাকাগুলো মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি এবং অনিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তাই একজন স্থপতি বা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের প্রথম দায়িত্ব হলো ভূমিকম্প-সহনীয় (Earthquake-Resistant) ডিজাইন নিশ্চিত করা এবং সঠিক কনস্ট্রাকশন পদ্ধতি অনুসরণ করা।
***ভূমিকম্প-সহনীয় ডিজাইনের মূল লক্ষ্য:
ভূমিকম্প কখনই সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু সঠিক ডিজাইন ভবনের জীবনরক্ষা ক্ষমতা (Life Safety) নিশ্চিত করতে পারে। অর্থাৎ, কাঠামো হয়তো সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু ভেঙে পড়বে না—এটাই ভূমিকম্প-সহনীয় ভবনের মূল উদ্দেশ্য।
***বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC)-এর অনুসরণ:
বাংলাদেশে ভূমিকম্প-সহনীয় ডিজাইনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো BNBC 2020। এতে উল্লেখ আছে—
সাইটের সিসমিক জোন অনুযায়ী ডিজাইন লোড নির্ধারণ
কন্সট্রাকশনে ব্যবহৃত উপকরণ ও স্ট্যান্ডার্ড
স্ট্রাকচারাল ফ্রেমিং, ফাউন্ডেশন, জয়েন্ট ডিটেইলিং ও ডাকটাইল ডিজাইন।
***বিল্ডিং আকৃতি ও স্থিতিশীলতার জন্য আর্কিটেকচারাল গাইডলাইন :
স্থপতি, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদার—সকলেরই BNBC কঠোরভাবে মেনে কাজ করা বাধ্যতামূলক।
***ভূমিকম্প-সহনীয় বিল্ডিং ডিজাইনের প্রধান উপাদান:
১. রেগুলার ও সিমেট্রিক্যাল বিল্ডিং শেপ:
অতি জটিল ও অসমান ভলিউম বা ক্যান্টিলিভার এক্সটেনশন ভূমিকম্পের সময় অসামঞ্জস্যপূর্ণ মুভমেন্ট তৈরি করে।
সেরা ডিজাইন হলো:
-সিমেট্রিক লেআউট
-সেন্ট্রালাইজড সিঁড়ি ও লিফট কোর
-সুষম লোড ডিস্ট্রিবিউশন
২. ড্যাকটাইল ডিজাইন (Ductile Detailing):
ভবন দুলবে কিন্তু ভাঙবে না—এটাই ড্যাকটাইল ডিজাইন। এর জন্য—
*কলাম ও বিমে সঠিক রিবার (Rebar) বাঁধাই
*কংক্রিট কভার বজায় রাখা
*শক্তিশালী কলাম–দুর্বল বীম (Strong Column – Weak Beam) কনসেপ্ট
*বীম-কলাম জয়েন্টে অতিরিক্ত স্টিরাপ ব্যবহার
*লো ইস্পাত ও কংক্রিটের গুণগত মান নিশ্চিত করা
৩. শিয়ার ওয়াল (Shear Wall) ডিজাইন:
উচ্চ ভবনের জন্য শিয়ার ওয়াল সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকম্প-প্রতিরোধ ব্যবস্থা।শিয়ার ওয়াল—
কম্পনের সময় পার্শ্বিক চাপ প্রতিরোধ করে
ভবনের দুলুনি কমায়। লিফট কোর বা সিঁড়ি কোরের সাথে ইন্টিগ্রেটেড হতে পারে
৪. ফাউন্ডেশন ডিজাইন:
ভূমিকম্পের সময় মাটির আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অনেক স্থানে লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি রয়েছে।
তাই—মাটি পরীক্ষা (Soil Test) অবশ্যই করতে হবে
র্যাফট ফাউন্ডেশন বা পাইল ফাউন্ডেশন প্রয়োজন হতে পারে বেজ আইসোলেশন (Base Isolation) প্রযুক্তিও বড় প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্য
৫. বিল্ডিং সেফটি সিস্টেম
ভূমিকম্পের সময় শুধু কাঠামো নয়, লিফট, সিঁড়ি, প্লাম্বিং, ইলেক্ট্রিক্যাল সিস্টেম—সবই নিরাপদ হওয়া জরুরি #।
***Safety Measures:
-লিফটে সিসমিক সেন্সর স্থাপন
-ইমারজেন্সি স্টেয়ারকেস এর ব্যবহার (স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী)
-ফায়ারপ্রুফ ও শক-প্রুফ ইলেকট্রিকাল সিস্টেম ইন্সটলেশন
-গ্যাস লাইনে অটোমেটিক শাট-অফ সিস্টেম ইন্সটলেশন
***ভূমিকম্প-সহনীয় নির্মাণকাজে সাধারণ ভুল (যা কখনই করা যাবে না):
-নকল বা নিম্নমানের রড/সিমেন্ট ব্যবহার
-কলামের আকার ভুলভাবে কমিয়ে ফেলা
-প্রশিক্ষণহীন মিস্ত্রি দিয়ে রিবার বাঁধাই
-আর্কিটেকচারাল পরিবর্তন করে কলাম ভেঙে ফেলা
-পার্কিং-লেভেলে ওপেন-গ্রাউন্ড স্টোরি (Soft Story) তৈরি
-অনুমোদন ছাড়া ফ্লোর অ্যাডিশন
এই ভুলগুলো একটি ভবনকে পুরোপুরি ভঙ্গুর (Collapse-Prone) করে তুলতে পারে।
ভূমিকম্পের পর ভবনের দ্রুত সেফটি মূল্যায়ন:
একজন ইঞ্জিনিয়ার ভূমিকম্পের পর নিচের বিষয়গুলো দেখে ভবনের ঝুঁকি নির্ধারণ করেন—
*কলাম, বীম, জয়েন্টে ক্র্যাক
*শিয়ার ওয়ালে ডায়াগোনাল ক্র্যাক
*ফাউন্ডেশনে স্লাইডিং বা সেটেলমেন্ট
*পাইপলাইন বা ইলেকট্রিক্যাল ক্ষতি
*ক্ষুদ্র ক্ষতিও উপেক্ষা করা যাবে না।
_স্থপতি নাজমুল হক নাঈম