01/10/2025
এডেনিয়ামের জন্য ফেব্রুয়ারি মাসটা ভীষণ ভাইটাল। ভাইটাল, কেননা এই মাসে শীত শেষে গরম পড়তে শুরু করে এবং এডেনিয়ামও শীতঘুম সেরে জেগে ওঠে। ফলে, এডেনিয়ামের নতুন চারা বসানো থেকে শুরু করে পুরনো গাছের প্রতিস্থাপন ও ফুল পাবার আগের মুহূর্তের জরুরি পরিচর্যার আবশ্যিক সময় হচ্ছে এই ফেব্রুয়ারি।
এডেনিয়াম পাঁপড়ির বিচারে দু’রকমের হয়—সিঙ্গল পেটাল ও ডাবল পেটাল। এই গাছ বছরে তিন বার ফুল দেয়। সমস্ত পাতা ঝরিয়ে এর শীতঘুম শুরু হয় ডিসেম্বর মাস থেকে। এই সময় কালেভদ্রে শুধু জল ছাড়া আর কিচ্ছু খায় না সে, ফুল দেওয়ার প্রশ্নই থাকে না। এর ঘুম ভাঙে ফেব্রুয়ারির শুরুতে। তারপর উপোষ ভেঙে সে তেড়েফুঁড়ে খেয়ে গায়ের জোর বাড়িয়ে পাতা গজিয়ে ডাল ছেড়ে ফুল দিতে শুরু করে মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরু থেকে।
আমরা সকলেই জানি যে, এডেনিয়াম খুব রোদ ভালোবাসে। ভীষণ খরা সহ্য করতে পারে সে। কেননা, এই গাছ মরুভূমির গাছ। একইসঙ্গে গোলাপের মতোই হাজার রঙের সৌন্দর্যময় ভ্যারাইটি রয়েছে এই গাছের, তাই এই গাছকে বাংলায় ‘মরুগোলাপ’ও বলা হয়। এই গাছ ছাদে বা ব্যালকনি বাগানে করতে হলে, এমন জায়গায় টব রাখতে হবে, যেখানে সাত থেকে আট ঘন্টা সরাসরি রোদ আসে। ভালো রোদ না-পেলে এই গাছ ফুল দেবে না। তাই যারা এবার নতুন এডেনিয়াম করবেন, তাঁরা এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখবেন।
এডেনিয়াম যারা করেন, শুধু ফুলের জন্য করেন না, এর গাছের সৌন্দর্যও দারুণ। গাছ বলতে এর কাণ্ডের সৌন্দর্য। যাকে বলা হয়, ‘কর্ডেক্স’। সেটা মোটা হয়ে হয়ে ঘটের আকার নেয়, তখন ফুলওয়ালা সমগ্র গাছটি চমৎকার একটি ফুলদানি বলে মনে হয়। সিঙ্গল পেটাল এডেনিয়ামের ডাল মাটিতে পুঁতলেই তা থেকে নতুন একটি গাছ পাওয়া যায়। কিন্তু ডালের গাছের কর্ডেক্স সাধারণত মোটা হয় না। কর্ডেক্স মোটা পেতে হলে আপনাকে বীজের গাছ চাষ করতে হবে। বাজারে বীজের চারা বা বীজের চারায় কলম করে সেটা বিক্রি হয়। সেগুলো বিভিন্ন সাইজের হয়ে থাকে। এবার আপনার পছন্দ অনুযায়ী একদম ছোট চারাও নিতে পারেন অথবা একটু বড়। কিংবা একেবারে তৈরি গাছ।
এডেনিয়ামের টব কেমন হবেঃ
যদি আঙুল-সাইজের চারা আনেন, তাহলে সেটা তিন থেকে চার ইঞ্চি পটে প্রতিস্থাপন করবেন। চারাটি যদি ছোট্ট পট বা পলিব্যাগে থাকে, তাহলে খুব সাবধানে তাকে সেখান থেকে প্রথমে বার করুন। তারপর মাটিশুদ্ধ শেকড়-অংশটা জলে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখুন। মাটি নরম হয়ে গলে গেলে সাবধানে মাটি ধুয়ে মাটি থেকে শেকড়শুদ্ধ গাছটা আলাদা করে ফেলুন। খেয়াল রাখবেন, শেকড়ে যেন আঘাত না-লাগে বা ছেঁড়ে। এবার এক চিমটে ছত্রাকনাশক (সাফ) ও আধ চা-চামচ এপসম সল্ট (সম্ভব হলে এর সঙ্গে দু’ফোঁটা হিউমিক এসিড) মিশিয়ে গাছের শেকড়-অংশটা মিনিট পনেরো ডুবিয়ে রাখুন। তারপর তুলে খোলা বাতাসে চারাটি রেখে দিন।
গাছের কর্ডেক্স মোটা করার জন্য এই গাছ প্রথম থেকেই বনসাই-পদ্ধতিতে চাষ করতে হয়। প্রয়োজনের চেয়ে ছোট টবে চারা বসাতে হয়। অন্য গাছের চারা যেমন প্রথমে আমরা মোটামুটি আট ইঞ্চি টবে প্রতিস্থাপন করি, এক্ষেত্রে কিন্তু তিন থেকে চার ইঞ্চি টবে চারা বসাবো। এই গাছ জমা জল একেবারেই পছন্দ করে না, গোড়া পচে সটান মারা যায়। তাই টবের তলায় বেশ কিছু ফুটো করে দিতে হবে, যাতে জল দেওয়ার পর এক মুহূর্তও তা না-জমে থেকে মাটি ভিজিয়ে নীচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। টবের এই ড্রেনেজ সিস্টেম এডেনিয়ামের ছোট-বড় সমস্ত রকম গাছের জন্যই মেন্টেইন করতে হবে। এটা ঠিক রাখলে এবং ডিরেক্ট সানলাইট পেলে বর্ষার টানা বৃষ্টিতেও এ-গাছের ক্ষতি হয় না।
এডেনিয়ামের মাটি কেমন হবেঃ
এডেনিয়ামের জন্য সঠিক খাবার সরবরাহ করবে, কিন্তু জল জমতে দেবে না; এমন মাটি তৈরি করে নিতে হবে। দোআঁশ মাটি এক ভাগ, বালি এক ভাগ, ভার্মি কম্পোস্ট বা এক বছরের পুরনো গোবর অথবা পাতাপচা সার এক ভাগ এবং বাকি এক ভাগে থাকবে সমান পরিমাণে কাঁকর ও কাঠ কয়লার টুকরো; এর সঙ্গে প্রতি টবের হিসেবে হাফ চামচ হাড়গুঁড়ো, হাফ চামচ শিং-কুচি, হাফ চামচ নিমখোল, এক চা-চামচ ফাঙ্গিসাইড ভালো করে মিশিয়ে নিলেই উপযুক্ত মাটি তৈরি হয়ে যাবে। এই মাটি ছোট থেকে বড় সমস্ত রকমের এডেনিয়ামের চারা রোপণ ও রি-পটিং করার জন্য উপযুক্ত মাটি। এই মাটি দিয়ে টবের আশিভাগ ভর্তি করে ঠিক মধ্যিখানে চারার শেকড়-অংশটা বসিয়ে চারপাশের মাটি ভালো করে চেপে দিন, তারপর পর্যাপ্ত জল ঢেলে দিন। চারদিন গাছশুদ্ধ টবটি ছায়ায় রেখে, পঞ্চমদিন থেকে ফুলসানলাইটে রাখুন।
এডেনিয়ামের খাবারঃ
ছোট্ট চারা বসানোর পর পরবর্তী কুড়ি থেকে পঁচিশদিন খাবার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। গাছকে নতুন মাটিতে জমিয়ে বসতে এটুকু সময় অন্তত দিন। মাটিতে থাকা খাবার এই সময় সে আরামসে খেতে পারবে। এরপর যখন খাবার দেওয়া শুরু করবেন, তখনও ঐ কুড়ি-পঁচিশ দিনের গ্যাপ রাখবেন। ছোট চারাকে এই সময় টব প্রতি এক চামচ বাদাম খোল ভেজানো জল বা দশঃছাব্বিশঃছাব্বিশ বা জিরোঃবাহান্নঃচৌত্রিশ এক লিটার জলে দু’গ্রাম মিশিয়ে দেবেন। আর দেবেন ফাঙ্গিসাইড একই পরিমাণে। এই খাবারগুলো একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেবেন।
বড় গাছের জন্য মাসে একবার টব প্রতি বাদাম খোল এক চামচ এক লিটার জলে ভিজিয়ে দেবেন। সিঙ্গল সুপার ফসফেট টব প্রতি এক চা-চামচ দেবেন। পনেরো দিন অন্তর সরষের খোল ভেজানো জল পাতলা করে দিয়ে যাবেন। এর সঙ্গে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দশঃছাব্বিশঃছাব্বিশ বা জিরোঃবাহান্নঃচৌত্রিশ এনপিকে এক লিটার জলে দু’গ্রাম টব প্রতি দিয়ে যাবেন। সঙ্গে দেবেন ফাঙ্গিসাইড। ব্যস, আর কিচ্ছু লাগবে না।
এবার বলি জলের কথা। গাছে জল দেবেন মাটি শুকিয়ে আসছে দেখলে তবেই। ভেজা মাটিতে জল দেবেন না, মাটি খটখটে হয়ে শুকিয়েও যেতে দেবেন না। এটা ছোট-বড় সব ধরণের গাছের জন্যই সমানভাবে মেন্টেইন করবেন।
এডেনিয়াম (মরুভূমির গোলাপ নামেও পরিচিত) গাছের পরিচর্যা অন্যান্য গাছের চেয়ে সহজ, এর জন্য পর্যাপ্ত সূর্যালোক, সঠিক মাটি এবং পরিমিত জল প্রয়োজন।
এডেনিয়াম গাছের পরিচর্যা:
আলো:
এই গাছ সরাসরি রোদ খুব পছন্দ করে এবং প্রতিদিন ৬-৮ ঘন্টা সরাসরি সূর্যালোকের প্রয়োজন হয়। সুস্থ বৃদ্ধি ও ফুল ফোটার জন্য পর্যাপ্ত সূর্যালোক গুরুত্বপূর্ণ।
মাটি:
এডেনিয়ামের জন্য এমন মাটি ব্যবহার করা উচিত যা জল নিষ্কাশনে সক্ষম। ৪০% মাটি, ৩০% কম্পোস্ট এবং ৩০% নুড়ি/বালি মিশিয়ে একটি পটিং মিডিয়া তৈরি করা যেতে পারে।
জল:
মাটি খটখটে হয়ে গেলে জল দিন, তবে অতিরিক্ত ভেজা মাটিতে জল দেওয়া উচিত নয়।
তাপমাত্রা:
তাপমাত্রা কমে গেলে অ্যাডেনিয়াম সুপ্তাবস্থায় চলে যেতে পারে এবং পাতা ঝরে যেতে পারে। এই সময় গাছগুলিকে ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে ঘরের ভিতরে রাখা ভালো।
সার:
সুপ্তাবস্থায় খুব অল্প আলোর প্রয়োজন হয় এবং এই সময়ে অন্ধকার গ্যারেজ বা শেডে রাখা যেতে পারে।
রোগ ও পোকা:
অ্যাডেনিয়াম গাছের রোগ ও পোকা দমনে সঠিক সময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সার প্রয়োগ:
ফুল আনার জন্য বিশেষ কোনো বিশেষ যত্নের প্রয়োজন নেই, তবে গাছের স্বাস্থ্যের জন্য সঠিক সময়ে সঠিক সার প্রয়োগ করা উচিত।