05/08/2013
শ্রেয়ান শ্রেয়সী
সজল শর্মা বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৪, ২০১১, ১০:৩৯
[লেখাটিতে প্রাচীন সাহিত্য রীতির অনুসরণ করা হয়েছে]
মোহিনীর মত তার রূপ দেখেছিলাম চিরবসন্তের কুঞ্জে
ফুলে ফুলে দলে দলে মধুকরের গুঞ্জন ছিল।
যেন তারাও প্রেমাষ্পদের খুঁজে ঠিক আমারই মত
বহুতে নয় আমি একেতে লীন হতে চাইলাম তার হৃদয়ে।।
গিরিখাত হতে প্রবাহিত নির্ঝরে স্নাত বস্ত্রসিক্তাকে দেখলাম
কামদেব আসলেন যদিও মদনের কাছে পরাস্থ ছিলাম আগে।
আমি পেলাম তাকে পেলাম সে শুধু আমার শুধু আমার
প্রেমাহত এমন প্রলাপ কোলাহল তুলল অন্তরে।।
দেবী আমাকে দেখল আমি দেবীকে দেখলাম
অতঃপর আমাদের নয়ন নয়নে পতিত হল।
দেবীর চোখের পাতায় কাজলের রেখা টানা ছিল
আমি সেই কাজলে প্রেমের কথা লেখে রাখলাম।।
সুচিস্মিতা দেবী আমার পানে স্মিত হাসিতে তাকাল
আমি হরিণের মত দাঁড়িয়ে রইলাম যেন সে শিকারি।
স্মিত হাসি তার মিলিয়ে গেল চকিতে যেন গভীর কাব্য সে
মনে হল তারও যৌবন মন্দিরে রতি দেবীর পূজার্ঘ চলছে।।
নিরবতা ভেঙ্গে সে বলল কে তুমি কুমার কেন এসেছ?
আমি তখনও ঘোরের মাঝে কল্পনায় সমাধিগ্রস্থ ছিলাম।
সে আবার বলল কিছু তো বল কোথা থেকে এসেছ সুপুরুষ?
কানে সুললিত কন্ঠ ঝংকার দিল আর আমি জাগলাম।।
বিপ্র তনয় আমি অদূর লোকালয়ে আমার আশ্রম কুঠির
শ্রেয়ান নাম আমার এসেছিলাম নির্ঝরের কাব্য রচনায়।
নিরালায় তোমাকে দেখলাম নির্ঝরের মত যৌবন স্রোতে
কাব্য ভুলে মনের কাছে হারলাম নিজেকে শিকার ভেবে।।
সুমধুর সরব হাসি গিরিগাত্রে প্রতিধ্বনিত হল সুরের মত
সুরের সুধা পান করলাম আমি সুরের নদীতে ভাসলাম।
কৃপা করে তোমার পরিচয় দাও লক্ষ্মীশ্রী দেবী
আমি এটুকু বলেই নিরব হলাম বশীভূত কপোতের মত।।
আমি জানতাম একদিন এমনই হবে ঋষি বলেছিলেন
আমিও অপেক্ষায় ছিলাম তোমার পুরুষ সেদিন থেকে।
আজ এসেছ তো সব বলব তোমায় কত কথা জমে আছে
তার চোখে প্রেম বিগলিত আদ্রতা দেখলাম।।
ব্যধ তনয়া শ্রেয়সী আমার নাম এই পাহাড়েই থাকি
নিকটেই পিত্রালয় মাতৃহীনা শৈশব থেকে।
ভবিষ্যদ্বানি ছিল পাণিপ্রার্থী হয়ে কাব্যের পুরুষ আসবে
সেই থেকে পরিণয়ের প্রতিক্ষায় প্রহর গুণছি তরুণ।।
আমি পরম সুখে উত্তাল হলাম বিধির এমন খেলা দেখে
আমি বললাম আমি তোমার পাণিপ্রার্থী দেবী সম্মতি দাও।
সংসারে গৃহত্যাগীর মত আছি অনেক কাল ধরে
আমাকে স্থির কর তোমার তনুমনের দাস কর।।
শ্রেয়সী মৌন ছিল আর তার চোখে সম্মতি ছিল দ্বিপ্রহর সাক্ষী
গিরি কাননে শিলাখণ্ডে বসলাম আমরা আর গল্প সিন্ধু হল।
গল্পকথার সকল প্রণয় অবগাহন শেষে আমাদের পরিণয় হল
আমাদের গান্ধর্ব পরিণয়ে গোধূলি দিল আবির আকাশ।।
রাত যখন হলো আকাশে তিথির চাঁদ উঠল তবে ক্ষণিকের
তবুও আমাদের পরিণয়ে অত্যানন্দের হিল্লোল তুলে গেল।
আমরা উঠলাম এবং অবগাহন শেষে পথ ধরলাম ব্যধ গৃহের
সেখানে হয়তো শ্রেয়সীর পিতা প্রতীক্ষায় তনয়ার।।
আমরা হাঁটলাম পাশাপাশি আর তার হাত ছিল আমার হাতে
বুকের যেপাশে হৃদয় আছে সেই পাশেই চলছিল শ্রেয়সী।
আমরা চলছিলাম আর মনে হচ্ছিল সবকিছু আশিস দিচ্ছে
পবন শুভগীত গাইছে যেন জোনাকি পথদীপ জ্বেলেছে।।
গিরিপথে আমাদের যুগল রূপ জানিয়েছিল কেউ পল্লীতে
সমস্ত ব্যধপল্লী আমাদের অভ্যর্থনায় ঢালি হাতে উন্মুখ ছিল।
ফুলের বৃষ্টি হল দীপের আরতি হল প্রকম্পিত হল মঙ্গলধ্বনি
বাদ্য নৃত্য গীতে জমে উঠল নিরব পল্লী পরম উৎসবে।।
মধ্যমণি ছিলাম আমরা আমাদের ঘিরেই এত আয়োজন
রাত বাড়ল একটু একটু করে আনন্দ মুখর হল প্রহরে প্রহরে।
কাল প্রাতেই শ্রেয়সী বিদায় নেবে শ্রেয়ানের সাথে
আমার পিতৃমাতৃহীন কুঠির সেই প্রতীক্ষাতেই যেন।।
————————
সরল সার-সংক্ষেপঃ
পাহাড়ের ঝরণা দেখে কবিতা লেখতে গিয়ে এক পণ্ডিতের(বিপ্র) ছেলে ঝরণায় স্নানরত এক যুবতীকে দেখে। যুবকের নাম শ্রেয়ান, পাশের লোকালয়ে তার কুঠির। তার মা বাবা নেই। যুবতী শিকারির (ব্যধ) মেয়ে, তার নাম শ্রেয়সী, তার বাবা আছেন কিন্তু মা নেই। শ্রেয়সীকে দেখে শ্রেয়ান প্রেমে পড়ে গেল, তার মনে কামনা জাগল শ্রেয়সীর রূপ দেখে। শ্রেয়সীও শ্রেয়ানকে দেখল, কিন্তু আশ্চর্য হল না, কারণ সে জানত এমন কেউ আসবে। শ্রেয়সীকে এক ঋষি বলেছিলেন তার ভবিষ্যত। শ্রেয়ান শ্রেয়সী একে অপরের সাথে কথা বলল। তারা পরিণয়ে সম্মত হল। নারী পুরুষের পরস্পর সম্মতিতে মিলিত হয়ে যে পরিণয় তাকে গান্ধর্ব বিয়ে বলে। তারা গান্ধর্ব বিয়ে করল। পরিণয় শেষে তারা শিকারিপল্লীতে গেল। কেউ পথে তাদের দেখে পল্লিতে জানিয়ে দিয়েছিল। সবাই তাদের অভ্যর্থনায় দাঁড়িয়ে ছিল। শ্রেয়সীর বিয়েতে আনন্দ ভরে গেল পল্লীতে। পরদিন সকালেই শ্রেয়ান শ্রেয়সীকে নিয়ে যাবে তার বাড়িতে।