30/06/2025
ছবিতে দেখানো গাছটি বিশল্যকরণী বা কাল বানসা গাছ।
ব্যাখ্যা:
সাধারণ নাম:
এই গাছটি বিশল্যকরণী বা কাল বানসা নামে পরিচিত। স্থানভেদে এটিকে কাঁটা বিশল্লা, কাঁটা বিশল্যকরণী, সিম-মুল্লি, সম্মুললি ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়।
বৈজ্ঞানিক নাম:
এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Barleria lupulina।
বিশল্যকরণী : প্রাচীন ঐতিহ্য ও আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা
রচনা ও চিত্রগ্রহণ - মৌমিতা দে
----------------------------------------------------------------------
হিন্দুদের মহাকাব্য রামায়ণ মতে রাম-রাবণের যুদ্ধে লক্ষ্মণের উপর শক্তিশেল বান নিক্ষেপণের পর লক্ষ্মণ শক্তিহীন ও মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে এবং সহোদর সহযোদ্ধা রামও সাথে ক্ষত-বিক্ষত হয়। বহু গাছ-পাতা তুলে আনতে হয় হিমালয় থেকে রাম-লক্ষণের চিকিৎসার জন্য তার মধ্যে চারটি বিশেষ বৃক্ষ ছিল। যথা : মৃত - সঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুবর্ণকরণী ও সন্ধানী।
মৃত সঞ্জীবনী মৃতকে প্রাণ দিতে পারে। বিশল্যকরণী পারে অস্ত্রের ঘা সারিয়ে তুলতে। সুবর্ণকরণীর পক্ষে সম্ভব অসুস্থতায় রং পাল্টে যাওয়া শরীরের রং ফেরানো। আর কাটা অঙ্গ জোড়া বা ভাঙা হাড় জোড়ার কাজ করে সন্ধানী। এই সব বৃক্ষের সন্ধান শুধু জানা ছিল হিমালয় নিবাসী রিক্ষরাজ জাম্বোবানের।
কথিত আছে যে দেবতাদের থেকে অমৃত-মন্থনের সময় জাম্বোবান জেনেছিলেন এই বিশল্যকরণীর কথা। ওই সময় ভেষজ আনয়নের দায়িত্ব নিয়ে মহাবলী হনুমানকে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। 'বিশল্যকরণী' বৃক্ষের খোঁজ না পেয়ে হনুমানের পুরো গন্ধমাদন পর্বত আনয়নের ঘটনা প্রায় সকলেরই জানা।
প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্র মতে ভেষজ গুনগুন সমৃদ্ধ বিশল্যকরণী অনন্য। বাংলা অভিধানে 'বিশল্য' শব্দের অর্থ বেদনাহীন, অর্থাৎ বিশল্যকরণী হল ব্যাথা নিবারণে সাহায্যকারী বর্ষজীবী গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ।
● বিস্তৃতি ও পরিচিতি :
প্রায় সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অল্প বিস্তর এদের বসবাস। গাছের পাতা গুলি গাঢ় সবুজ বর্ণের এবং মাঝখান বরাবর মধ্যেশিরাটি লালচে বর্ণের যা পত্রশীর্ষের দিকে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এসেছে। প্রত্যেকটি পাতার গোড়ায় কাঁটা বর্তমান।
Acanthaceae পরিবারের এই উদ্ভিদটি ডিসেম্বর-মার্চ মাস পর্যন্ত ফুল ধারণ করে। মোচাকৃতির পুষ্পবিন্যাসের মাথায় অপূর্ব সুন্দর স্বর্ণাভ হলদে রঙের ফুলের আধিপত্যের জন্য একে 'মোচা-শির-স্বর্ণমুখী' নামেও অভিহিত করা হয়।
এছাড়া স্থান ভেদে এই উদ্ভিদ কাঁটা বিশল্লা, কাঁটা বিশল্যকরণী, সিম-মুল্লি, সম্মুললি প্রভৃতি বাংলায় সাধারন নামে এবং Hop-headed Barleria or Hophead plant নামক ইংরেজি নামেও প্রসিদ্ধ। এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিকসম্মত নাম : Barleria lupulina.
● ভেষজ গুণাবলি :
১. ভেষজ গুণাগুণে ভরপুর বিশল্যকরণী মহামূল্যবান এবং অতি প্রয়োজনীয় ঔষধি বৃক্ষ। এই গাছের পাতা ও শিকড় বেটে লাগালে কাঁটা-ব্যথা ও ক্ষতস্থান দ্রুত সেরে যায়। পুরনো ব্যথার উপশমে বিশল্যকরণী বিশেষ কার্যকরী।
২. বিশল্যকরণীতে উপস্থিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পোড়া ঘা তাড়াতাড়ি সারিয়ে তোলে।
৩. এই উদ্ভিদের পাতার রস ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিহত করতে সাহায্যকারী।
৪. চুলকানি, অ্যাকজিমা এবং কাঁটা ফোঁটায় বিশল্যকরনীর পাতা বেটে লাগালে খুব ভালো উপকার পাওয়া যায়।
৫. এছাড়া Chickenpox ও Harpes simplex এর ক্ষেত্রে বিশল্যকরনী গাছের পাতা ও পোকা-মাকড় ও বিছের কামড়ে মূল ও পাতা উভয়েই বিশেষ উপযোগী।
যদিও বর্তমানে বিশল্যকরণী গাছের সংখ্যা ও ব্যবহার আগেকার দিনের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে । কিন্তু গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা এখনও প্রয়োজনে এই ঔষধি উদ্ভিদের যথার্থ ব্যবহার করেন এবং উপকৃতও হন।
----------------------------------------------------
প্রবন্ধ লিখন ও চিত্রগ্রহণ : মৌমিতা দে
চিত্রগ্রহণের স্থান : গড়বেতা, পশ্চিম মেদিনীপুর
তথ্য পরিমার্জন ও রূপায়ণ : সিদ্ধার্থ শঙ্কর মন্ডল
#বিঃদ্রঃ প্রকাশিত প্রবন্ধ ও চিত্রসমূহের সত্ত্বাধিকার লেখিকার নামেই সংরক্ষিত।
#বিশল্যকরণী
#প্রাচীন_আয়ুর্বেদ_শাস্ত্র