21/08/2026
আমরা সবাই বিশ্বাস করি—আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা। আমাদের গায়ের রং, উচ্চতা, নাক-চোখের আকৃতি, চেহারা—সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। এগুলোর কোনোটাই আমরা নিজেরা বেছে নিয়ে পৃথিবীতে আসিনি।
আজ একটা ঘটনা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে।
এক জায়গায় গিয়েছিলাম।সেখানে কয়েকজন বাচ্চা ছিলো।শুনলাম,একজন বাচ্চা (৭-৮ বছর) তার নাকের দুই পাশে স্কচটেপ লাগিয়ে রেখেছে। তার এক আত্মীয় তাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এমন করছ কেন?”
বাচ্চাটি খুব স্বাভাবিকভাবেই বলল, “আমি আমার নাকটা ঠিক করতে চাই।”
কথাটা শুনে আশেপাশের অনেকেই বিষয়টাকে হাসির ঘটনা হিসেবে নিল। কিন্তু আমি বাচ্চাটাকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি তোমার নাকটা ঠিক করতে চাও কেন?”
সে বলল, “আমার নাক বোচা। সবার নাক সুন্দর।”
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাক বোচা—এ কথা তোমাকে কে বলেছে?”
এরপর সে যাদের কথা বলেছে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না,তারা তার সবচেয়ে আপনজন।
সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো—আমরা বড়রা প্রায়ই ভাবি, “ও তো ছোট, ও আবার কী বোঝে!” কিন্তু একটা শিশু হয়তো অনেক কিছুই বোঝে, শুধু সেটা আমাদের মতো করে প্রকাশ করতে পারে না।
একটা শিশু যদি একবার-দুবার কোনো কথা শুনেই নিজের চেহারা পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে বুঝতে হবে কথাটা হয়তো তার কাছে একবার-দুবার বলা হয়নি। কথাটা হয়তো এতবার বলা হয়েছে যে সেটা ধীরে ধীরে তার নিজের সম্পর্কে বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
আমরা যখন কারও গায়ের রং নিয়ে কথা বলি, তাকে খাটো বলে হাসি, তার নাক নিয়ে মন্তব্য করি, তার চোখ, চেহারা কিংবা শরীরের কোনো অংশকে “ভালো না” বলি—আমরা হয়তো এটাকে নিছক মজা মনে করি। কিন্তু যার কথা বলা হচ্ছে, তার কাছে সেটা মোটেও মজা নাও হতে পারে।
বিশেষ করে শিশুর ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়ংকর হতে পারে।
আজ সে ভাবছে, “আমার নাক বোচা।”
কাল সে হয়তো ভাববে, “আমি দেখতে সুন্দর না।”
আর একদিন যখন সে একটু বড় হবে এবং বুঝবে যে তার এই চেহারা, এই নাক, এই চোখ, এই গায়ের রং—সবই আল্লাহর সৃষ্টি, তখন তার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, “আল্লাহ অন্যদের এমন বানালেন, আমাকে এমন কেন বানালেন?”
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি—আমাদের একটা কথাই হয়তো একজন মানুষের নিজের সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি নিয়ে অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে?
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।”
— সূরা আত-তীন, ৯৫:৪
আমরা যদি সত্যিই বিশ্বাস করি যে আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তাহলে তাঁর সৃষ্টি নিয়ে কাউকে অপমান করার আগে আমাদের একটু থামা উচিত।
কারণ মানুষ নিজের গায়ের রং বেছে নেয়নি।
নিজের নাকের আকৃতি বেছে নেয়নি।
নিজের উচ্চতা বেছে নেয়নি।
নিজের চোখ, মুখ কিংবা শরীরের গঠনও বেছে নেয়নি।
তাহলে যে জিনিসগুলো তার নিজের হাতে নেই, সেগুলো নিয়েই আমরা কেন তাকে সবচেয়ে বেশি কথা শোনাব?
আপনি যখন কাউকে বারবার বলেন, “তুমি খাটো”, “তুমি কালো”, “তোমার নাক বোচা”, “তোমার চেহারা এমন হলে ভালো হতো”—তখন আপনি শুধু একজন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন না; আপনি ধীরে ধীরে তার নিজের সম্পর্কে ধারণাটাকেও বদলে দিচ্ছেন।
তাই কাউকে নিয়ে মজা করার আগে একটু ভাবুন।আপনার কাছে কথাটা হয়তো কয়েক সেকেন্ডের হাসি।কিন্তু অন্য একজনের কাছে সেটাই হতে পারে বছরের পর বছর বয়ে বেড়ানো একটা কষ্ট।
বিশেষ করে শিশুদের সামনে এবং শিশুদের নিয়ে—সাবধান হোন।
কারণ তারা ছোট, কিন্তু তাদের অনুভূতিগুলো ছোট নয়।
The Crochet Corner