06/05/2026
নিখিল :
প্রতিটি বাঙালি বাড়ি এক একটি গল্প বহন করে।
সেই গল্প কেবল ছাদের তলায় চার দেয়ালের নয়, গল্পটা স্মৃতির : স্থান-কাল-পাত্রে গাঁথা অগণিত মুহূর্তের। প্রজন্মান্তরে সময় অতীত হয়ে যেতে পারে, কিন্তু স্থান আর পাত্র রয়ে যায়~নিঃশব্দ প্রতিধ্বনির মতো ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়ায়।
এই বাড়িটি, যার নাম ‘নিখিল’, মূলত স্থান ও পাত্র~এই দুই চিরন্তন সত্তার মধ্যকার সুনিবিড় আলাপন। পাত্র-পাত্রীদের কোনো এক পূর্বপুরুষের নাম থেকেই নিখিলের উৎপত্তি।
মানুষ তার নতুন ঘরে স্থায়ীভাবে পা রাখে ঠিক, কিন্তু তারও একটি সূচনাবিন্দু থাকে। তারা তাদের অতীতকে সঙ্গে নিয়ে ঢোকে~একজন বিধবা টাঙিয়ে রাখেন স্বামীর ছবি, মা সাজিয়ে তোলেন পারিবারিক প্রতিকৃতি, বাবা খুঁজে নেন বইয়ের জন্য কোনো একটি কোণ, আর শিশুরা খুঁজে বের করে নেয় তাদের খেলাধুলার জায়গা। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই নতুন দেয়ালের ভেতর আবার গড়ে তোলে স্মৃতির বসতি।
যে বাড়ির গল্প বলছি, তার বাসিন্দারা মূলত বাঁচেন শিল্পচর্চায়, স্মৃতিতে আর একসঙ্গে থাকার উষ্ণতায়।
একজন চিকিৎসক ও তাঁর স্ত্রী নৃত্যশিল্পী নীলাঞ্জনা দাশ, তাদের এক কন্যা এবং দুই মা~সবাই মিলে এই ঘর ভাগ করে নিচ্ছেন। তাদের বাবারা আর নেই, কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভূত হয়। বলা যায়, এই বাড়িটি দুই পরিবারের বুননে তৈরি একটি নকশিকাঁথার এক অনবদ্য উপমা।
এই পরিবারটির শিকড় লুকিয়ে আছে আশি-নব্বই দশকের সিলেটের সাংস্কৃতিক আবহে~কবিতা, সংগীত আর নৃত্যের সমৃদ্ধ সময়ে। নীলাঞ্জনা, যিনি একসময়ে ছিলেন নাচের ছাত্রী, তিনি আজ নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুল ‘নৃত্যশৈলী’র পরিচালক। তার স্বামী শুধু পরিবারের অংশ হিসেবে নয়, শিল্পের এক নীরব সহযাত্রী হয়ে পাশে আছেন সবসময়।
তাই যখন তারা তাদের বাড়ি বানানোর কথা ভাবলেন, একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল : নৃত্য যেন এ-বাড়ির হৃদয়ে অবস্থান করে, সমস্ত পরিসরগুলো যেন নাচের তালে তাল মেলায়।
এভাবেই নাচের জায়গাটিকে কেন্দ্র করে তারই চারপাশে গড়ে উঠল বাকি সব~নিচতলায় নাচের স্কুল, উপরে বসবাসের জায়গা, দুই মায়ের জন্য আলাদা কামরা, আর ছাদ~যেখানে আকাশের সঙ্গে মিশে গেল নাচের গতি আর ছন্দের দ্যোতনা।
সিলেটের ঘনিষ্ঠতামাখা এক-পাড়ার মাঝে দাঁড়িয়ে এই বাড়িটি বাইরের দিক থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখে না, নীরবে মিশে যায় চারপাশের সাথে, নিজের সমৃদ্ধি লুকিয়ে রাখে ভেতরে ।
অন্দরমহলে ফুটে ওঠে ‘শান্তরস’-এর এক সরল-গভীর মগ্ন-প্রশান্তি। এমন এক নীরবতা, যেখানে স্মৃতি, শিল্পচর্চা আর প্রতিদিনের জীবন একসাথে সহাবস্থান করে। তবুও এই বাড়ি অন্যদের জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে রাখে~নৃত্যচর্চাই হয়ে ওঠে এক সেতুবন্ধন~বয়স আর শ্রেণির ভেদাভেদ পেরিয়ে মানুষকে একত্র করে। ব্যক্তিগত পরিসর থাকে অন্তরঙ্গ, আর ভাগাভাগির জায়গাগুলো আমন্ত্রণ জানায় সংযুক্তির, যেভাবে নৃত্য এক করে শরীর আর আত্মাকে।
গৃহে প্রবেশ শুরু হয় একটি অন্তর্ভর্তি তলায় (ছ-ফুট সিঁড়ি বেয়ে মেজানাইন ফ্লোর থেকে), যেখান থেকে চলাটা দু-দিকে বিভক্ত হয়~ডানদিকে নেমে গেলে নৃত্যের পরিসর, বাঁ দিকে উঠে গেলে দু-তলায় থাকার ঘর। দু-তলার মাঝখানে একটি খোলা জায়গা যেখান থেকে আরেকটি সিঁড়ি তিনতলায় উঠে গিয়েছে, যা আলো আর বাতাস দিয়ে সবতলাকে যুক্ত করেছে।
এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক বসার-ঘর (ড্রইং রুম) নেই; বরং দু-তলার ওই মধ্যবর্তী খোলা পরিসরখানা স্বচ্ছতায় প্রবাহমানতায় এমনভাবে মুক্ত হয়ে খুলে যায় (প্যাভিলিয়নের মতো ), বাদবাকি সব পরিসরগুলো যেন আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। আকাশ-জানালা, পুরোনো-কায়দার ঝিলিমিলি-জানালা আর নকশা-করা ইটের জালির মধ্য দিয়ে বাতাস এখানে অবাধ, আলো করে খেলা। কনক্রিট-জালির রেলিং ও দেয়াল আলো আর হাওয়াকে ছেঁকে এনে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।
ইটের ত্রিভূজাকৃতি বুনন ও কনক্রিট-জালিতে ব্যবহৃত ত্রিভূজাকৃতি নকশাগুলো নিছক অলংকার নয়, ত্রিভুজের ছন্দ ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের জ্যামিতিকেও ধারণ করে।
শেষপর্যন্ত এই বাড়িটি কেবল একটি নির্মাণ নয়। এটি এক বানিয়ে তোলা নীরব-বিন্যাস: আলো ও ছায়ার, জল ও হাওয়ার, অতীত ও বর্তমানের। নীরবতা আর কলরবের মিলনে গড়া একটি স্থাপত্যপ্রয়াস।
একটি বাড়ি, যেখানে স্মৃতি শুধু সংরক্ষিতই হয় না, সহজ-সাবলীলতায় নতুন রূপে জন্মও নেয়।