21/02/2026
"অনন্য অনুভূতি"
আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি। মেয়ে বিয়ে করে বিদেশে সেটেল্ড। আর ছেলে চাকরি সূত্রে বম্বেতে থাকে সপরিবারে। রিটারমেন্টের পর ভাবলাম গিন্নিকে নিয়ে একবার ছেলের কাছ থেকে ঘুরে আসি। ওখানে আমরা ৭ দিন মতো ছিলাম। এই ৭ দিনে জীবনের এক অদ্ভুত রূপের সম্মুখীন হলাম। তাই প্রবন্ধের আকারে লিখে রাখলাম আগামী প্রজন্মের জন্য যাতে তারাও পরে বুঝতে পারে দিন কেমন ধীরে ধীরে বদলায় আর যে বদলটা দেখলে একনিমেসে এক অজানা দৌড়ে ছুটে চলা নতুন এক পৃথিবীর খোজ পাওয়া যায়। যাকগে সেসব কথা।
আমাদের ছোটবেলায় অনেক ভাই বোনের মাঝে এক ভরা ও ভিড়ের সংসারের দেখা মেলে, যে ভিড়ে আমরা কখনও হারাইনি, বরং একে অন্যকে অনেক কাছে পেয়েছি, সর্বদা পাশে পেয়েছি।
আর এখন দেখলাম বাবা মা ও তাদের একমাত্র সন্তান। ভরা সংসারও নয় আর ভিড় সে আর নাই বললাম। তবে এখন সংসারের ভিড় না থাকলেও বোম্বের ওই দুকামরার ফ্ল্যাট এ ওরা হারিয়ে যায়, একে অন্যকে খুঁজে পায়না। কাজেই কাছের মানুষকে কাছে পাওয়া পাশে পাওয়া সেও আর হয়ে ওঠেনা। তবে সেটাও হয়তো ওদের উপলব্ধির মধ্যে নেই। ওরা এভাবেই হারিয়ে গিয়ে নিজেকে নিয়ে বেশ আছে।
বাবা অফিসের ডেস্কে হলুদ রঙের ফাইলটা দেখতে না পেলে অফিসের লোকজনকে ফোন করে ব্যতিব্যস্ত করে। অথচ সকালের ব্রেকফাস্ট টেবিলে অথবা রাতের ডিনারে ছেলেকে দেখতে না পেলেও মনের কোথাও কোনো প্রশ্ন জাগেনা।"আচ্ছা ওর শরীর ঠিকআছেতো"। না বাবা আর জানতেও চায়না। তাই হয়তো ছেলেও তার স্কুলের প্রোগ্রামে প্রথম গান গাইতে স্টেজে ওঠার কথা বাবা মার কাছে বলেনা। ও নাকি একটু introvert। ও নিজের মধ্যেই ভালো থাকে , নিজে নিজেই গান করে। ওরা আজ আর আমাদের ছোটবেলার মত বাবা মা সব ভাইবোন একসাথে আগুনের পরশমনি গায়না। তাই তার মানেও বোঝেনা। ওরা জীবনের মানে খুঁজে বেড়ায় মোবাইলের রিলে।
নাতি আর দাদুর কাছে গল্পো শুনতে চায়না আজ। ঠাম্মার কাছে এসে বায়নার ঝুড়ি খুলে বসেনা।
ছেলে সারাদিনের অফিসের ব্যস্ততা সেরে, পার্টি সেরে টলোমলো পায়ে যখন বাড়ি ঢোকে, তখন বৌমার নাইট কলিং এ নাকি ভিসি (ভিডিও কনফারেন্স) চলছে, সে নাকি শেষ হতে মাঝ রাত। নাতি তার পছন্দের pogo অথবা ডোরেমন দেখে ঘুমের দেশে। খেলো কিনা ওরা তাও জানিনা। গত ৫ টা দিন এভাবেই কেটেছে। কাল বিকেলের ট্রেনে বাড়ি ফেরা। তাই ভেবেছিলাম আজ রাতটাএ অন্তত যদি সবাই একটু একসাথে খেতে বসতাম, একসাথে একটু আড্ডা হত, খাবার শেষ পাতে এঁটো হাতে থালায় আঁকিবুঁকি কাটা। নাতি সাহেও একটু আমাদের ছোটবেলায় স্বাদটা পেতো নিজের খাবারের সাথে।
এসব শুধু আমার ভাবনায় থেকে গেলো। নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে পরের দিন ট্রেনে উঠে বসলাম। ছেলে বৌমা নাতি সবাই ছাড়তে স্টেশনে এসেওছিল। শুধু ট্রেন ছাড়ার আগে ছেলেকে বলে এলাম "তোদের কাছে সময়টা কম মনে হলেও, আমাদের কাছে তা এখন লম্বা। কাজেই তোদের এই স্বল্প সময়ের মাঝে পরিবারের সাথে একসাথে যে মুহূর্তগুলো কাটাবি সেগুলোই জীবনের বড় সময়, বড় মুহূর্ত হয়ে থাকবে"। "Zindagi Badi Honi Chahiye Babumosai, Lambi Nahi "(Film : Anand)
নিজেদের হাথগুলো একে অপরে শক্ত করে ধরিস বাবা। নাহলে ভিড় না থাকলেও তোরা আস্তে আস্তে হারিয়ে জাবি। ভালো থাকিস তোরা।
- অভীক বোস