27/03/2026
🙏🌼🙏🌼🙏🌼
জয় ঠাকুর জয় মা
দক্ষিণেশ্বরে এক বুড়ি এসেছেন ঠাকুর দেখতে। তার হাতে একটি পাতার ঠোঙায় দুখানা সন্দেশ। সামান্য অবস্থার মানুষ, এর বেশি আর কী দিয়ে তােমার সেবা করতে পারি? তুমি দান দেখ না, প্রাণ দেখ। কিন্তু ঠাকুরের ঘরে ঢুকবে কী করে? সেখানে প্রচণ্ড ভিড়।
নবতে এসে মা-ঠাকরুনকে বললে, - “তুমি বুঝি পরমহংস মশায়ের পরিবার? একটু সন্দেশ এনেছিলুম তাঁকে দেব বলে। তা সেখানে যা ভিড় ঢুকতে পেলুম না। তা তােমাকে দিয়ে যাই, তুমিই আমার হয়ে তাঁকে এটুকু খাইয়ে এসাে মা। আমি ততক্ষণ না হয় তােমার এখানেই বসে থাকি।"
মা বললেন, "বাইরের লােক থাকলে আমি তাে যাই না ওই ঘরে। তোমার তাে কোনাে বাধা নেই, তুমিই গিয়ে নিজ হাতে দিয়ে এস ঠাকুরকে। ঠাকুর তো কারো একলার নন, তিনি সকলের।"
সাহস করে গেলেন বুড়ি। দেখলেন, তক্তপােশের নিচে ভক্তরা তাদের নৈবেদ্য সাজিয়ে রেখেছেন। বুড়ি তার ছােট ঠোঙাটি সেই স্তুপের মধ্যে একটু ফাঁক করে গুজে রাখলেন। আর দাঁড়ালেন না। ঠাকুরকে একটা দণ্ডবৎ দিয়ে চলে গেলেন আপন মনে। সে যে দিতে পেরেছেন তাতেই তিনি চরিতার্থ। সে দানে ধনী নয়, দিতে পারায় ধনী।
ভাবাবেশ প্রশমিত হলে ঠাকুর খেতে চাইলেন। ইশারা বুঝতে পেরে তক্তপােশের নিচে থেকে সবচেয়ে বড় ঠোঙাটি বার করলেন গৌরী মা।
এ ঠোঙা ঠাকুরের পছন্দ হলো না। বললেন, - “এটা নয়, আরেকটা।"
বড়টা রেখে গৌরীমা মাঝারি সাইজের একটা ঠোঙা আনলেন। "না, ওটাও নয়। আরেকটা। ছােটটা।"
দুখানা মােটে সন্দেশ। ঠাকুর অস্থির হয়ে উঠলেন। গৌরী মা বুড়ির ঠোঙাটা বার করলেন এবার। কিছু না বলে ঠাকুর হাত বাড়িয়ে কেড়ে নিলেন ঠোঙাটা। খেলেন সন্দেশ দুটো। একেই তাে বলে ভক্তের ভগবান। ভগবান ভক্তাধীন, ভক্তপরবশ।
যারা জপধ্যান করছেন তাদের ডেকে ডেকে খেতে দিচ্ছেন ঠাকুর। বলছেন, "ওরে পেট ঠাণ্ডা করে ডাক। সন্তান পেট ঠাণ্ডা করে ডাকলে কি মা রাগ করেন। মা কি পর? আগে খেয়ে নে, তারপর আবার জপধ্যান করবি।"
গৌরীমাকে বললেন, "যা তুই সকলকে খাবার দিয়ে আয়।"
সেদিন গৌরীমা অনুপস্থিত, রাখালের খিদে পেয়েছে এটা ঠাকুর টের পেয়েছেন। আর অমনি ঠাকুর গঙ্গার ধারে গিয়ে ডাকতে শুরু করেছেন আর্তকণ্ঠে, ‘'ও গৌরদাসী, আয় না চলে, আমার রাখালের খিদে পেয়েছে।"
শূন্য নদীর দিকে তাকিয়ে রাখাল বলছে, "নদীতে গৌরদাসী কোথায়? খুব ডাকলেই এসে পড়বে।"
ঠাকুর সরল বিশ্বাসে বললেন, "তাকে পাঠিয়ে দেবেন ভগবান।"
রাখাল আপত্তি উঠল, "তাকে পাঠালেই বা কী। খাবার আসবে কোথা থেকে। তােমার দক্ষিণেশ্বরে কিছু পাওয়া যায় না, দোকান নেই কাছাকাছি। গৌরী এসে করবে কী? দোয়াত আছে কালি নেই। হাঁড়ি আছে চাল নেই।"
"না, না, গৌরদাসী এলে খাবারও আসবে", ঠাকুর বললেন গাঢ়স্বরে।
"গৌরী আমার খাদ্যের ভাণ্ডার" বলে আবার আর্তনাদ শুরু করলেন। "ও গৌরদাসী, আমার রাখালের বড় খিদে পেয়েছে। শিগগির আয় খাবার নিয়ে।"
রাখাল তারস্বরে প্রতিবাদ করছে “ছি ছি, খিদের কথা এমনি করে রাষ্ট্র করে নাকি কেউ? লােকে ভাববে কী। বলবে কী। কী ভাববে।"
"কী বলবে! সরল সহজ খিদে পেয়েছে সত্য কথাটা বলব না চেঁচিয়ে? তা হলে যে তুই লােকে কী বলবে কী ভাববে বলে ঈশ্বরক্ষুধাও চেপে রাখবি? ওই দ্যাখ, দূরে একটা নৌকো আসছে", ঠাকুর বললেন উৎফুল্ল হয়ে।
"ওইটাতে নিশ্চয়ই আছে গৌরদাসী আর সঙ্গে এক রাশ খাবার", রাখাল পরিহাস করে উঠলেন।
নৌকাটা স্পষ্ট হল ক্রমে। সন্দেহ কী, দক্ষিণেশ্বরের ঘাটের দিকেই আসছে।
"ওই তাে বলরাম দাঁড়িয়ে। আর, হাঁ, ও কে? ও কে ভেতরে বসে! সন্দেহ কি, গৌরদাসী। আর তুই বলতে চাস গৌরদাসী খালি হাতে এসেছে?" বললেন ঠাকুর।
গৌরীমা এক গামলা রসগােল্লা নিয়ে নামলেন। "এবার? বল এল কিনা গৌরদাসী। খাবার নিয়ে এল কিনা।"
ঠাকুর শিশুর মত লােভালু চোখে তাকালেন রাখালের দিকে, "খা না কটা খাবি।"
(শ্রী অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত সংকলিত, পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ)
শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত