14/01/2017
বাংলাদেশের স্থাপত্য শিল্প
রবিউল হুসাইন
বাংলাদেশের স্থাপত্য, সাহিত্য ও শিল্প বিষয়াদিতে এক সময় গৌরবময় সোনালি ঐতিহ্য ছিল, যা মহাস্থানগড়ে খ্রিস্ট-পূর্ব তৃতীয় শতাব্দী এবং পাল আমলে ৭৫০ থেকে ১১৬১ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ৪১১ বছরব্যাপী বিকশিত হয়েছিল। এই আমলেই কালজয়ী বাঙালি শিল্পী, ভাস্কর ও স্থপতি ধীমান এবং তার ছেলে বীতপালের আবির্ভাব ঘটে। এর পর সুলতানী আমল, যদিও সুলতানরা এদেশের মূল অধিবাসী ছিলেন না, তবুও সেকালে বাঙালি শিল্প-সাহিত্য-স্থাপত্যের সোনালি যুগ হিসেবে পরিচিত। সুলতানী বা ইলিয়াসশাহী আমল অর্থাৎ ১৩৪২ থেকে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দ মোট ২৩৩ বছর পর্যন্ত বাঙালি শিল্প, স্থাপত্য, সাহিত্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করেছিল। মুঘল-পূর্ব ও মুঘল আমলের স্থাপত্যধারা মিলেমিশে একে মিশ্র ইন্দো-মুঘল রীতির সৃষ্টি হয়। বাঙালি স্থপতি বিদ্যাধর ভট্টাচার্য রাজা জয়সিং-২-এর আমলে জয়পুর শহরের নগর পরিকল্পনা করেছিলেন। তাজমহলের দেয়ালে সূক্ষ্ম ও অপূর্ব নকশায় বাঙালি কারুশিল্পীরাও জড়িত ছিলেন। এদের জন্য আমরা সবসময় গর্ব অনুভব করি। প্রকৃতপক্ষে এই যুগ সত্যিকারের মূল বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক সভ্যতা বিকাশের পথকে উন্মুক্ত করে তুলেছিল। এই সোনালি সূত্রের পরম্পরা ইংরেজ আমল থেকে ধীরে ধীরে ছিন্ন হতে থাকে এবং তা পাকিস্তানি আমলের দীর্ঘ সামরিক শাসনকালে আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। ইংরেজ আমলে প্রথমবারের মতো ঢাকায় ইউরোপীয় স্থাপত্যের সূচনা হয়। তার ফলে এক ধরনের মিশ্র স্থাপত্যকলা অনুসারিত হতে থাকে। মুঘল থেকে শুরু করে গ্রিসীয়, রোমক, ভিক্টোরিয়া প্রমুখ স্থাপত্যরীতির মিশেলে ইংরেজরা ভবন স্থাপন করতে শুরু করে। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে কার্জন হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, সেক্রেটারিয়েট ভবন, বর্তমানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পুরনো হাইকোর্ট এবং কিছু আবাসিক এলাকায় বাড়ি-ঘর নির্মিত হয়। সে সময় ১৯৭১ সালে পরিকল্পনাবিদ প্যাট্রিক গেড্ডেস ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিবোদন কেন্দ্র, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলো চিহ্নিত করে একটি নগর পরিকল্পনার অবতারণা করেন। কিন্তু পরে তার বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তী সময়ে উদ্ভিদবিদ প্রাউডলকের পরামর্শে রমনা পার্ক এলাকাও পরিকল্পনার অধীনে আসে এবং সেভাবে তা গড়ে ওঠে। ইংরেজদের উদ্ভাবিত ওই ঐপনিবেশিক মিশ্র স্থাপত্যরীতি দেশের অন্যান্য স্থানের দালান-কোঠায় অনুসারিত হতে থাকে, বিশেষ করে রেলওয়ে স্টেশন, কোর্ট ভবন, সার্কিট হাউস, সরকারি অফিস, আবাসিক গৃহ, স্কুল-কলেজ ইত্যাদি ভবনে।
উল্লেখ্য, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন ইংরেজরা ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে বলবৎ করে এর ফলে একশ্রেণীর নব্য ধনী সম্প্রদায় জমিদারি প্রথার প্রভাবে বাবু সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শুধু কলকাতা নয়, দেশের গ্রামবাংলার সুদূরতম প্রান্তেও বিভিন্ন ধরনের দালান-কোঠা নির্মিত হয়। এসবের মধ্যে প্রাসাদ, মন্দির, মসজিদ, বাগানবাড়ি, শিক্ষালয় উল্লেখযোগ্য এবং এগুলো মিশ্র স্থাপত্য ভিক্টোরিয়া আর ইন্দো-সারাসেনিকরীতি বা কলোনিরীতির নিদর্শন হিসেবে দেখতে পাওয়া যায়। তবে এ কথা ভুললে চলবে না যে, কালের নিয়মে সেই ভবনগুলো আমাদের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্বকালের ২৪ বছর অর্থাৎ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই সময় ঢাকা শহরে প্রথমবারের মতো আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের সূচনা হয় এবং তা শুরু হয় দুটি ভবনের মধ্য দিয়ে। একটি হচ্ছে আর্ট ইনস্টিটিউশন ভবন এবং আর একটি হচ্ছে বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগার ভবন, সেগুলো স্থপতি মাজহারুল ইসলাম ১৯৫৪ সালে নকশা করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি দেশের প্রথম আধুনিক স্থপতি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। সেই সময় দেশে কোনো উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন স্থপতি ছিলেন না। ফলে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে অনেক ভবন বিদেশি স্থপতিদের নকশা দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে সরকারি গণপূর্ত বিভাগে প্রধান স্থপতি হিসেবে ব্রিটেনের মি. হিকস ও পরে মি. ম্যাককোনেল দায়িত্বে ছিলেন। বিদেশি, তবে যোগ্যতাসম্পন্ন স্থপতিদের দ্বারা নকশা করা অনেক উল্লেখযোগ্য ভবন পরবর্তী সময়ে নির্মিত হয়েছিল, সেসবের মধ্যে নিুোক্ত ভবনের নাম করা যেতে পারে। আমেরিকার বব বুই ও ড্যানিয়েল ডানহাম কর্তৃক কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাস; গ্রিসের ডক্সিডিয়াম কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, ঢাকার হোমইকোনমিক কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং সেন্টার, কুমিল্লার গ্রাম উন্নয়ন একাডেমি, আমেরিকার পল রুডলফ দ্বারা ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস ও শিক্ষকদের আবাস; রিচার্ড নয়ট্টার একই জায়গায় একাডেমিক ভবন; প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রিচার্ড ভ্রম্যানের স্থাপত্য বিভাগ ভবন; একই জায়গায় জেমস ওয়ালডেনের শিক্ষকদের আবাস; টাইগারম্যান কর্তৃক দেশের ৫টি শহরে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট; ইতালির স্পিরো কর্তৃক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো ইত্যাদি। ১৯৫৯ সালে ব্রিটেনের একটি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঢাকা শহরের সামগ্রিক পরিকল্পনা করা হয় এবং সেই অনুসারে তা গড়ে উঠতে থাকে। স্থাপত্যশিল্প বিকাশের সেই সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, একটি হচ্ছে ১৯৬১ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্যশিল্প ও পরিকল্পনার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্রম শুরু আর একটি হচ্ছে পৃথিবীখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশা অনুযায়ী শেরেবাংলা নগর এবং সংসদ ভবনের নির্মাণ কাজের শুভারম্ভ। এই প্রকল্প স্বাধীনতা-পূর্বকালে শুরু হয়েছিল এবং স্বাধীনতা লাভের পর শেষ হয়। পরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থাপত্য বিদ্যাশিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের দুটি প্রধান শিক্ষালয়ে প্রথম স্থাপত্য বিদ্যাশিক্ষা সূচনার মাধ্যমে স্থাপত্য পেশার ক্ষেত্রে অতিউৎসাহ-উদ্দীপনা ও আগ্রহের সৃষ্টি হতে থাকে এবং তা এখনো চলছে। এসব কারণে প্রমাণিত হয় যে, আমরা স্থাপত্যশিল্পে দিন দিন স্বাবলম্বী হচ্ছি। এই সঙ্গে বেসরকারি প্রায় ছয়-সাতটি স্থাপত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও খুব প্রশংসনীয়ভাবে শিক্ষা পরিক্রমা পরিচালনা করে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে বোঝা যায় দেশে স্থপতিদের মাধ্যমে স্থাপত্যসেবা, শিক্ষা প্রদান ও তার চর্চার কার্যক্রম দিন দিন অনেক উন্নতি লাভ করেছে।
অন্যসব শিল্পের সূতিকাগার হিসেবে স্থাপত্যশিল্প একটি মাতৃভাষা সৃষ্টির উৎস এবং মনীষী গ্যাটে দ্বারা সংজ্ঞায়িত এ রকম যে, একই শিল্প জমাট বাঁধা সংগীত ছাড়া আর কিছুই নয়। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নির্মিত সংসদ ভবন আধুনিক সময়ে একটি কালজয়ী কীর্তি, যা এ দেশসহ গোটা পৃথিবীর জনগণ ও স্থপতির কাছে সবসময় একটি অনিঃশেষ অনুপ্রেরণা হয়ে রইবে এবং বিংশ শতাব্দীতে নির্মিত ২০টি শ্রেষ্ঠ ভবনের মধ্যে এটি হচ্ছে তার নিজ স্থাপত্যগুণে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভবন। এই ভবনটি সাধারণ মানুষ, স্থপতি এবং ছাত্র-শিক্ষার্থী সবার জন্য একটি অনুপম স্থাপত্য উদাহরণ, যার মাধ্যমে নাগরিক সমাজে আধুনিক স্থাপত্য সৌন্দর্যের যৌক্তিকতা এবং মূল্যবোধ নিয়ে সৃষ্টির একটি উজ্জ্বল সূচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এ কথা উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশে আধুনিক স্থাপত্যের প্রারম্ভকাল ছিল চমৎকার ও খুবই আশাব্যঞ্জক। পঞ্চাশ দশকে আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের প্রবর্তন বাঙালি স্থপতি কর্তৃক প্রচলিত হয়। পরবর্তীকালে বিদেশি স্থপতিরা সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং সেই মশাল এখন দেশের তরুণ স্থপতিরা সামনের দিকে বয়ে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। দেশে আধুনিক স্থাপত্যের প্রয়োজন ও গুরুত্বের প্রতি সার্বিকভাবে সবাই আকর্ষিত হচ্ছেন। স্থাপত্য শিল্প অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে। তরুণ প্রতিভাবান স্থপতিদের নকশাকৃত ভবন সমাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে এবং খুব গর্বের সঙ্গে বলা যায় যে, দেশে যেসব ভবন এখন নির্মিত হচ্ছে, সেগুলোর মূল নকশায় আছেন এই তরুণ সৃষ্টিশীল প্রতিভাদীপ্ত স্থপতিরা ও তারা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী এবং স্বাধীন।
বর্তমানে দেশে সব ধরনের ভবন নির্মিত হচ্ছে, সার্বিকভাবে সেগুলো ৫টি ভাগে ভাগ করা যায়। ক. আবাসিক, খ. অফিস বা বাণিজ্যিক, গ. শিল্প কারখানা, ঘ. শিক্ষালয়, উপাসনালয়, হাসপাতাল, দোকানপাট, স্মৃতিসৌধ, ক্রীড়া ও বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি এবং ঙ. সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ বিষয়ক। সাধারণত দুটি প্রতিষ্ঠান এসব ভবনের নকশা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি হচ্ছে সরকারি স্থাপত্য অধিদফতর এবং আরেকটি হচ্ছে বেসরকারি স্থাপত্য উপদেষ্টা কার্যালয়। বেসরকারি স্থপতিদের দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন স্থাপত্য উপদেষ্টা কার্যালয়ের মাধ্যমে বর্ণিত ৫টি উৎসের পক্ষে সাধারণত দেশে বেশিরভাগ ভবনের নকশা হয়ে থাকে। ক. সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, খ. বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান, গ. বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও, ঘ রিয়েল এস্টেট সংস্থা কর্তৃক বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্রকল্প এবং ঙ. ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্রকল্পগুলো। স্থপতিরা সাধারণত বেসরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন, গৃহ এবং নকশা করার কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। এগুলো নির্মিত ও স্থাপিত হয়েছে এবং হচ্ছে বারিধারা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা, পুরানা পল্টন, সিদ্ধেশ্বরী, সেগুনবাগিচাসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায়। এ ধরনের বাণিজ্যিক ও আবাসিক নির্মাণ কাজ ঢাকা শহর ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, সিলেট ইত্যাদি শহরেও শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, সেখানে স্থানীয় স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানের স্থপতি দ্বারা স্থাপত্য পেশার চর্চা শুরু হয়েছে। স্থপতি মাজহারুল ইসলাম একদা স্বাধীনতা-পূর্বকালে ঢাকা শহরসহ গোটা বাংলাদেশে অনেক উল্লেখযোগ্য বসতবাড়ি ও বিভিন্ন বাণিজ্য এবং শিক্ষা প্রকল্পের নকশা করেছিলেন, এখন নতুন প্রজšে§র তরুণ স্থপতিদের দ্বারা সেই ধারাবাহিকতা চলে আসছে। এদের মধ্যে অনেকেই তাদের নিজ নিজ স্থাপত্য সৃষ্টির মাধ্যমে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেছেন এবং কেউ কেউ দেশে-বিদেশে স্থাপত্য পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। তাদের কাজের পরিচিতি বিদেশি স্থাপত্য পত্রিকাতেও নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে।
বহুতলবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান আমলে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নকশা অনুসারে মতিঝিলের কৃষি ভবন এই ধরনের প্রথম কোনো বাঙালি স্থপতিকৃত স্থাপত্যকর্ম নিদর্শন। স্থপতিদের নকশায় দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় শিল্প কারখানা তৈরি হয়েছে এবং এই কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, অফিস ভবন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাসপাতাল ভবনগুলো উল্লেখযোগ্য নির্মিত হয়েছে। ক্রীড়া ক্ষেত্রেও এ রকম দেখা যায়, ঢাকার মিরপুরে সুইমিংপুল, ইনডোর স্টেডিয়াম ও অন্য স্টেডিয়ামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় জিমনেসিয়াম এবং অন্য ভবনগুলো সাফল্যজনকভাবে এদেশের স্থপতিদের নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়িত। ভবন পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। আহসান মঞ্জিল, বাংলা একাডেমীর বর্ধমান ভবন, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। কোনো কোনো পুরনো আবাসিক ভবন নতুন করে সংস্কার করে রেস্টুরেন্ট হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, যা প্রণিধানযোগ্য। এনজিও প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের গ্রামাঞ্চলের বেশকিছু অফিস ও আবাসিক প্রকল্প স্বল্প খরচ আর এদেশীয় নির্মাণ উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে এদেশের মূল ও আদি স্থাপত্যধারা প্রকাশের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। আঞ্চলিক স্থাপত্যধারার একটি বলিষ্ঠ রূপও এসবের মধ্য থেকে ফুটে বেরিয়ে আসে। হাতে তৈরি ইট, বাঁশ, কাঠ, টালি, মাটির পুরু দেয়াল, ঢালু খড়ের ছাদসদৃশ অবয়ব নিয়ে এই ধরনের ভবনগুলো গ্রামের বিস্তৃত পটভূমিতে একটি আন্তরিক ঘনবদ্ধ পরিবেশের ইতিবাচক সৃষ্টি ও ঐতিহ্যবাহী লোকজ ধারাকে উজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। দেশি ও বিদেশি স্থপতি দ্বারা এরূপ স্থাপত্যকর্ম বেশ কয়েকটি জায়গায় সফলভাবে সমাধা হয়েছে।
রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকা শহরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন এবং শপিং সেন্টারের প্রভূত বিস্তার লাভ হয়েছে। প্রায় প্রতিটি স্থপতি এই কার্যক্রমে জড়িত, বিশেষ করে আবাসিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে। বিষয়টি বেড়েই চলেছে, যেহেতু তা নগরবাসীর আবাসিক সমস্যার অনেক সমাধানের ইঙ্গিত দেয়। যদিও শহরের কম ধারণ ক্ষমতা বিশেষ করে বিনোদন, যাতায়াত, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অপ্রতুলতা ও পরিকল্পনাহীনতা বিদ্যমান। এই পরিপ্রেক্ষিতে এগুলোর আশু সমাধান অতীব প্রয়োজন, তা না হলে দেশে ক্রমান্তর কৃষি জমির স্বল্পতাসহ অন্যান্য সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট হয়ে উঠতে থাকবে। আমাদের দেশে আর একটি অনন্য স্থাপত্য বিষয় পরিচিতি লাভ করেছে। সেটি হচ্ছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন আন্দোলনে অগণিত শহীদের উদ্দেশে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। এটি প্রথম দেখা যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিহত ছাত্রদের স্মরণে নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মাধ্যমে। পরে এটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয় অজানা শহীদদের স্মরণে সাভারের আকর্ষণীয় ১৫০ ফুট উঁচু স্মৃতিসৌধ। পরবর্তূকালে বেশ কয়েকটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার চত্বরে শহীদ মিলন স্মৃতিমিনার, নেত্রকোনায় সুসংদুর্গাপুরে কমরেড মণি সিং ও টংক আন্দোলন স্মরণে একটি ৪০ ফুট উঁচু এবং আর একটি হাজং মাতা রাশমণির উদ্দেশে নির্মিত। এই দুটি স্মৃতিসৌধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের নিহতদের উদ্দেশে উপাচার্য ভবনের সামনে সড়কদ্বীপে নির্মিত স্মৃতিসৌধ, যেখানে পোড়ামাটির কাজ দেখা যায়। সম্প্রতি আরো উল্লেখযোগ্য দৃষ্টিনন্দন এবং গভীর ভাব উদ্রেককারী দু’জন নবীন স্থপতির নকশাকৃত স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে, সেটি হচ্ছে রায়েরবাজার বধ্যভূমি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী শহরে রাস্তার সড়কদ্বীপ, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ৭০ ফুট উঁচু স্মৃতিসৌধ ৫টিও উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি মিরপুর বধ্যভূমি প্রাঙ্গণেও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃক একটি স্থাপত্য নিদর্শন সৃষ্টি করা হয়েছে।
এভাবে লক্ষ্য করা যায় স্থাপত্যশিল্প বিবেচনায় সব ধরনের ভবন এদেশের স্থপতিদের নকশা অনুযায়ী নির্মিত হচ্ছে এবং নানাবিধ প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও তারা একাগ্রভাবে তাদের সৃষ্টিশীল স্থাপত্যকর্মে নিমগ্ন রয়েছেন। এ কথা সত্যি যে, স্থপতিরা এখন পর্যন্ত তাদের নিজস্ব স্থাপত্য ভাষা খুঁজে পাননি, তবে তারা মন-প্রাণ দিয়ে তাদের কাজের মাধ্যমে সেটি খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং এই একাগ্রতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পরই জাগ্রত হয়েছে, যেখানে তারা নিজের অস্তিত্ব, শেকড় ও ঐতিহ্যের প্রতি মনোযোগী হয়েছেন সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং পরিবেশের কারণে। এখন যে স্থাপত্যরীতি ব্যবহৃত হচ্ছে তাকে এক কথআ মিশ্ররীতি বলে অভিহিত করা যায়, যা স্থপতিদের বিভিন্ন স্থাপত্যকর্মে প্রকাশ পাচ্ছে। বর্তমানে স্থাপত্যশিল্প আধুনিকতা, ঐতিহ্য, স্থানীয় রীতি, কৌশল এবং সেসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে একের সঙ্গে অনেকের মিশেলে বা সংমিশ্রণে বাস্তবায়িত ও নির্মিত হচ্ছে। এই পটভূমিতে বিভিন্ন স্থাপত্য সৃষ্টিতে সজাগ থেকে স্থপতিদের সঠিক পথটি খুঁজে বের করতে হবে, যেখানে জনগণ, মাটি, পরিপ্রেক্ষিত, সমাজ ও ঐতিহ্যের স্বরূপ অর্জনই হবে মূল কথা। এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে বহমান ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনুসারে, সর্বোপরি আধুনিক এবং সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে। বাঙালির প্রাচ্য ঐতিহ্য, ইউরোপের প্রতীচ্য সংস্কৃতি ও দেশের গৌরবময় ইতিহাসের ভেতরে থেকে মূল দেশীয় স্বরূপ সন্ধানে স্বকীয়তা, আধুনিকতা এবং ভবিষ্যৎ দিয়ে তৈরি একটি ত্রিভুজ টানাপড়েনের মধ্যে ডুবে থেকে সেই মৌলিক শিল্প আবিষ্কার করতে হবে। সেই সত্যশিল্পটিকে খুঁজে পেয়ে এটিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা এখন সব স্থপতির পবিত্র কর্তব্য, দায়িত্ব ও লক্ষ্য এবং এ কথা অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের বেলায়ও প্রযোজ্য।
লেখক: স্থপতি ও কবি