10/11/2023
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম (সিআইএইউ) একটি স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সংস্থাটি মানবিক ও সকলের অংশীদারিত্বভিত্তিক পরিকল্পনার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্ভাবনী সমাধান প্রদানে কাজ করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে সিআইএইউ।
গত পাঁচবছরের এই যাত্রায় ব্র্যাকের ৮টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজাইন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাভার ক্যাম্পাসের ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও এক্সটেরিয়র রেনোভেশন করেছে সিআইএইউ, যা ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। এর পাশাপাশি কক্সবাজারে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে রোহিঙ্গা স্কুল নির্মাণ, চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন গণপরিসরের উন্নয়ন প্রস্তাবনা, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন উড়ালপথের নিচের পরিত্যক্ত জমির আর্থসামাজিক মূল্যায়ন; সৈয়দপুরে তরুণদের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাস্টারপ্ল্যান, প্রান্তিক এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জন্য স্বল্পখরচে মানসম্মত শৌচাগারের প্রোটোটাইপ তৈরি ও নির্মাণ, এবং আড়ং-এর ৪০ বছর পূর্তিতে আয়োজিত উৎসবের প্যাভিলিয়ন ডিজাইন করেছিল সিআইএইউ। এছাড়াও ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ডিজাইন কম্পিটিশনে অংশ নিয়ে সম্মাননা অর্জন করেছে সংস্থাটি।
বর্তমানে কুমিল্লার ঠাকুরপাড়ায় ব্র্যাকের একটি বহুতল অফিস ভবন ডিজাইন করছে সিআইএইউ। ঢাকার বাইরে এটিই হবে ব্র্যাকের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ রিজিওনাল অফিস। এছাড়া ইউএনডিপি’র সহযোগিতায় ঢাকা উত্তর সিটির কয়েকটি ফ্লাইওভারের নিচের অব্যবহৃত জায়গায় গণপরিসর তৈরির গবেষণাকাজ চলছে।
প্রথাগত পাঠচর্চার বাইরে বাস্তব প্রেক্ষাপটে স্থানিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে স্থাপত্যের শিক্ষকদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার উদ্দেশে ২০১৭ সালে অধ্যাপক ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদ সিআইএইউ প্রতিষ্ঠা করেন। সেসময় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের চেয়ারপারসন ছিলেন তিনি। সিআইএইউ-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তিনি নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান স্থপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থাপত্য বিভাগের অধীনে প্রতিষ্ঠার পর প্রথমদিকে বিভাগের শিক্ষকরাই বিভিন্ন প্রকল্প ডিজাইন করার কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। পরে ২০১৮ সালে স্বতন্ত্রভাবে যাত্রা করে সিআইএইউ। একদল তরুণ স্থপতি এতে যোগ দেন।
এদিকে ২০১৭ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৮টি নতুন আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় ব্র্যাক। এর আগে ব্র্যাকের প্রথম প্রজন্মের অফিসগুলো নির্মিত হয়েছিল সত্তর থেকে আশির দশকে। ভাড়া নেওয়া বাড়িতে বা প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক স্থানে আধপাকা ভবনেও ব্র্যাকের কার্যক্রম চালানো হচ্ছিলো। সেসব ভবনে পর্যাপ্ত স্থান সংকুলানের অভাব ছিল। বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষেত্রে সুবিধাভোগীদের সেবা দেওয়ার কাজে সমস্যা দেখা দিতো। সবমিলিয়ে এসব স্থাপনার স্বকীয় কোনো স্থাপত্য-বৈশিষ্ট্য ছিল না। বিষয়টি সংবেদনশীলভাবে সঙ্গে বিবেচনা করে স্থাপত্যনকশা করার দায়িত্ব আসে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ ও সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজমের (সিআইএইউ) ওপর। অধ্যাপক ড. আদনান মোর্শেদ এই প্রকল্পে নেতৃত্ব দেন। নির্বাচিত জমিগুলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটা দল গঠন করা হয়। দলগতভাবে আলোচনার মাধ্যমে আটটি অফিস প্রোটোটাইপ ডিজাইনের কাজ শুরু হয়। প্রতিটির ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ু ভিন্ন ছিল, সেটা মাথায় রাখা হয় প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু করে ওয়ার্কিং ড্রয়িং পর্যন্ত।
এই প্রকল্পে প্রথম ধাপে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে যৌথভাবে কাজ করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ ও সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম। এতে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করেছেন স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষকরা। এসব গ্রুপে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প স্থপতি হিসেবে কাজ করেছেন তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক একেএম সিরাজুদ্দিন, ড. মোহাম্মদ ফারুক, ড. ইফতেখার আহমেদ, এবং ড. মোহাম্মদ হাবিব রেজা। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন প্রভাষক মো. সামিউর রহমান ভুঁইয়া। স্থপতিদের দলে আরও ছিলেন সহকারী অধ্যাপক শামস মনসুর গনি, শেখ রুবাইয়া সুলতানা, ড. নন্দিনী আওয়াল, জ্যেষ্ঠ প্রভাষক তানজিনা খান, আমির ইবনে শরিফ, সাদিয়া সাবরিনা, প্রভাষক এস এম কায়কোবাদ, তাসমিয়া কামাল, গবেষণা সহযোগী কোংখাম প্রিহান থইবা, মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, রাইদ মোহাম্মদ ইউসুফ, আয়শা লাবিবা খলিল, শিক্ষাদান সহকারী নুহা আননূর পবনী এবং মোহাম্মদ আশরাফুল আলম। পরামর্শক হিসেবে যুক্ত ছিলেন স্থপতি মুসতাসিম খান। দাপ্তরিক কাজে সহায়তা করেছেন সাইদুজ্জামান শিকদার ও এজিএম ফয়সাল হক।
২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদের নেতৃত্বে এককভাবে কাজটি সম্পন্ন করে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম। এসময় প্রকল্প স্থপতি হিসেবে যোগ দেন মুনতাসির হাকিম। পরে প্রকল্প স্থপতি হিসেবে সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন এস এম শাফায়েত মাহমুদ। তিনি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া এই পর্যায়ে সহযোগী স্থপতি হিসেবে যুক্ত ছিলেন তাহসিন রেজা আনিকা, রায়হান সাদিব আহমেদ, হাসানুর রহমান ও রুকাইয়া বিনতে করিম। পরামর্শক হিসেবে প্রকৌশলী মো. শাহ আলম তালুকদার, রেজাউল হাসান ও কিঙ্কর পাণ্ডে কাজ করেছেন। দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেছেন আরিফুল ইসলাম ও মো. রাসেল মিয়া।
ব্র্যাকের নতুন প্রজন্মের অফিস ডিজাইন করার কাজে এর স্থাপত্য-দর্শনের ধরন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো। একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্র্যাকের দর্শন কেমন, সেটা বোঝা এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাহাত্তর সালে যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে ব্র্যাকের যাত্রা শুরুর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল গরীব মানুষের পাশে দাঁড়ানো। স্যার ফজলে হাসান আবেদ বুঝতে পেরেছিলেন, যুদ্ধকালীন সময়ে সব হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোর আত্মপ্রত্যয় জাগাতে হবে। কারণ দারিদ্র্য তাঁদের আত্মমর্যাদা ছিনিয়ে নেয়। শুরু থেকেই স্যার আবেদ ব্র্যাককে প্রাতিষ্ঠানিকরণের দিকে জোর দিয়েছেন যেন এটা কোন ব্যক্তি-নির্ভর সংগঠন না হয়। তিনি ভাবতেন, গরীব মানুষ কেমন করে ক্ষুদ্রঋণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা প্রাথমিক শিক্ষা পেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার রাস্তা পাবে; দক্ষতা অর্জন তাদের জীবন বদলাতে সহায়ক হবে। ব্রাজিলিয়ান শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেয়ার যেমন তাঁর 'পেডাগজি অব দ্য অপ্রেসড' বইতে উন্নয়ন দর্শনে বলেছিলেন, নিপীড়িত মানুষ আসলে নিজস্ব চিন্তাধারায় আবদ্ধ থাকে। কোনোভাবে যদি তাদের সংগঠিত করা সম্ভব হয়, তবে তাদের জীবন সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে, নিজেদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এতে করে পুরো কাজটি সহজ হয়ে যাবে।' ব্র্যাকের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো ডিজাইন করার কাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এই বিষয়গুলোকে স্থাপত্যের ভাষায় রূপান্তর করা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে ড. আদনানের নেতৃত্বে সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, নতুন কার্যালয়গুলোর স্থাপত্যনকশার মূল দর্শন হবে এমন যে— এসব কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা তৃণমূলের মানুষ যেন কোনোপ্রকার হীনমন্যতায় না ভোগেন। সাধারণত বাংলাদেশের সমাজে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে একপ্রকার দুর্দশাগ্রস্থ মনোভাব কাজ করে। স্থাপত্যের ধরন যেন তাদের মধ্যে দুর্দশার পরিবর্তে আশাবাদ কিংবা স্বাতন্ত্রের অনুভূতি জাগ্রত করে, যাতে করে তারাও নিজেদেরকে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার বলে মনে করেন— এমনটাই ছিল ডিজাইনের প্রধানতম দিক।
এক্ষেত্রে চারটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, উন্নয়নের সঙ্গে স্থানের সম্পর্ক কী। দ্বিতীয়ত, ব্যবহারকারীদের মধ্যে আশা-আকাঙ্খা তৈরি করবে, এমন স্থাপত্য তৈরির উপায় কী। তৃতীয়ত, সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ফলাফল তৈরি করা। চতুর্থত, প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্যের চিত্র আরোপিত হওয়াকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় কী, যাতে করে সেবাগ্রহীতাদের স্বাত্রন্ত্র্যবোধকে উৎসাহ দেওয়া যায়; এবং গ্রাম-সম্পর্কিত গৎবাঁধা ধারণা থেকে বের হয়ে গ্রামের আধুনিকায়নকে সমর্থন করা যায়, আবার ঐতিহ্যের প্রতিফলনও সেখানে বজায় থাকে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল গ্রামীণ বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য উপযোগী একটি টেকসই স্থাপনা ডিজাইন করার দারুণ সুযোগও ছিল এই প্রকল্প। কৃষিখাতের আধুনিকায়ন, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, উদীয়মান উদ্যোক্তাদের অগ্রসর হওয়া এবং উচ্চাকাঙ্খী শ্রেণির উত্থান দ্বারা চালিত এক নতুন গ্রামীণ সমাজ এখন প্রতীয়মান। সরকারের নীতিগত সহযোগিতা, বেসরকারি সংস্থার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, এবং মানুষের উচ্চাশা, সবমিলিয়ে নতুনধারার আধুনিক গ্রামীণ, কিন্তু ঐতিহ্যের প্রতিফলন আছে, এবং সাশ্রয়ী ও জলবায়ু-উপযোগী স্থাপনা সেখানে সবচেয়ে বেশি মানানসই হবে বলে সিদ্ধান্ত নিলেন স্থপতিরা।
সমাজের দারিদ্র্য নিরসন করতে হলে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করতে হবে। সকলের জন্য সমানভাবে উন্নয়ন করতে হবে। দারিদ্র্য কোনো নিয়তি নয়, এটি শুধুমাত্র সঠিক সুযোগ-সুবিধা থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখে। যথাযথ উন্নয়ন মানুষের ভেতরের স্বাতন্ত্র্যবোধের ক্ষমতায়ন ঘটায়। নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেছেন, স্বাতন্ত্র্য হলো দারিদ্র ও সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি মৌলিক উপাদান। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক ও সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজমের স্থপতিরা এসব ধারণাকে স্থাপত্যের ভাষায় তুলে ধরার দায়িত্ব নেন। স্থাপনার ভেতর মানুষের অবাধে চলাচল নিশ্চিত করা, প্রশান্তি, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ, এবং পরিবেশের প্রতি সহনশীলতা ধরে রাখার চেষ্টায় স্বাতন্ত্র্যবোধের স্থানিক রূপ অন্বেষণ করেন তাঁরা। স্পেস ডিজাইন বা অ্যালোকেশনের ক্ষেত্রে তারা লক্ষ্য রাখেন, জায়গাটি যেন ব্যবহারকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যের হয়। এর আগে পুরনো অফিসগুলোর যে সংকট ছিল তা হলো— পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোবাতাস চলাচলের অভাব, লিঙ্গবান্ধব শৌচাগার না থাকা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা না থাকা এবং সেবাগ্রহীতাদের বৈঠকের স্থানের অভাব। এক কথায়, অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ থেকে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে বের করা হয়েছে এই প্রকল্পে।
ব্র্যাকের নতুন প্রজন্মের এই অফিস স্পেস ডিজাইন করার কাজে গ্রামীণ প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা খোঁজার চেষ্টা করেছেন ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদ। নদীমাতৃক ব-দ্বীপের বৈশিষ্ট্য, প্রাচীন দোচালা ঘর, এবং উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ, পাশাপাশি দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত এবং কৃষকের কুড়েঘরই ছিল তাঁর ভাবনার মূল উপজীব্য। এই সকল বিষয় এক সুতোয় গেঁথে আনতে কয়েকটি ‘কনসেপ্ট স্কেচ’ করেন তিনি। ব্র্যাকের আদর্শিক প্রতিফলন তুলে ধরার চেষ্টা এতে ছিল, তেমনি স্থাপনাটি যেন মানবিক হয় এবং দারিদ্রের বিপরীতে শক্তি যোগায়, সেই ধারণাই ছিল নকশা ও নির্মাণের প্রতি পরতে পরতে। তাছাড়া, একটি টেকসই অফিস ডিজাইন করার ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে বড় আকারে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির চেষ্টা করা হয়, যেটি স্থাপত্য প্রকল্পের ব্যবহারকারীদের আচরণেও প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।
প্রকৃতপক্ষে খুবই ছোট আকারের জমিতে ব্র্যাকের একেকটি কার্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটির ভেতর অল্পজায়গায় ব্র্যাকের ১৪টি কর্মসূচির সেবা সন্নিবেশিত করতে হয়েছে। আলাদা করে পাবলিক, সেমি-পাবলিক ও প্রাইভেট জোন রাখা হয়েছে, সেবাগুলোর সুবিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে যেন তা ব্র্যাকের কর্মী ও সেবাগ্রহীতা উভয়ের জন্যই উপভোগ্য হয়। আর ভবনের মাঝে রাখা হয়েছে কোর্টইয়ার্ড বা উঠান, যা নিরবছিন্ন আলোবাতাস চলাচলের ব্যবস্থা তৈরি করেছে। নির্মাণ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে এবং স্থানীয় শ্রমিক ও মিস্ত্রীরাই নির্মাণকাজ করেছেন। আধুনিকতা থাকলেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের ছাপও এতে স্পষ্ট ফুটে ওঠেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত ব্র্যাকের নতুন প্রজন্মের এমন ৮টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মধ্য থেকে বাছাই করা পাঁচটির স্থাপত্যশৈলী নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে 'আর্কিটেকচার অ্যাজ ফ্রিডম' বা 'স্থাপত্যে স্বাতন্ত্র্য' শীর্ষক এক প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। গত ১৮ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসির ডিস্ট্রিক্ট আর্কিটেকচার সেন্টারে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী আয়োজনে স্বাগত বক্তব্য দেন ডিস্ট্রিক্ট আর্কিটেকচার সেন্টারের ডিরেক্টর ম্যারি ফিচ। কিউরেটর হিসেবে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন স্থপতি অধ্যাপক ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদ। এছাড়া অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দ্য ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পিটার কিলপ্যাট্রিক, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কংগ্রেসম্যান জিম মোরান, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সাবেক কূটনীতিক ড্যান মজিনা, স্যার ফজলে হাসান আবেদের জীবনী নিয়ে লেখা বই 'হোপ ওভার ফেইট'-এর লেখক স্কট ম্যাকমিলান, সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান, দ্য ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আমেরিকার স্থাপত্য বিভাগের ডিন মার্ক ফার্গুসন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যের অধ্যাপক জুলিও বারমুডেজ। এই আয়োজনে অতিথিরা বলেন, ‘আদনান মোর্শেদ ও তাঁর সহকর্মীদের স্থাপত্যকর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ব্র্যাক সম্পর্কে অনেককিছু জানার সুযোগ হলো। বাংলাদেশের তৃণমূলের চিরায়ত স্থাপনা আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে।’
এই প্রদর্শনীর কো-কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন স্থপতি মো. ফয়সাল কবির হিমুন। তাঁর স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ফ্রেমওয়ার্ক স্টুডিও ব্র্যাকের পাঁচটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের স্কেল মডেল তৈরি করেছে। এছাড়া এসব প্রকল্পের ছবি তুলেছেন স্থপতি আসিফ সালমান, যা প্রদর্শনীর পেছনের মূল উপাদান ছিল। প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে 'আর্কিটেকচার অ্যাজ ফ্রিডম' নামেরই একটি বই। ড. আদনান মোর্শেদের সম্পাদনা ও নির্দেশনায় বইটি কম্পোজ করেছেন স্থপতি ইরতেজা আমিন তন্ময়। আয়োজন সহযোগিতায় ছিলেন আদনান সাকিব, সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার, ইসরাত জাহান অন্তি, জুলিয়ানা ডিমেগলিও, ব্র্যাড টিগেস, সাদিয়া ইশতিয়াক, জুলিয়ানা কিগেল, ম্যারি জেন হিউজ, মেলিসা কাজানসি, নোশিন তাসফিয়া প্রমা, ম্যাথু জেরনিস, জুয়ান সোটো এবং ব্র্যাডেন গিলমোর।
সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম মনে করে, বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তুলতে প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। নগর ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ঐতিহ্য খুবই শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ফলে যেকোনো প্রকল্পে ‘ঐতিহ্য’কে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসাবে ব্র্যাকের সাফল্যের পেছনে বড় কারণ হলো, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সামাজিক কার্যক্রমের যে চাহিদা তৈরি হয়েছিল, সেটা তারা সার্থকভাবে পূরণ করেছে। আর এতে ছিল স্যার আবেদের মতো দক্ষ নেতৃত্ব। পঞ্চাশ বছর পার করা ব্র্যাক এখন আরও পরিণত, আরও শাণিত। আর এই যাত্রায় যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কর্মীরা, পাশাপাশি আসছে নানা পরিবর্তন— যা ব্র্যাকের পথচলাকে আরও বেগবান করতে ভূমিকা রাখছে। ৮টি নতুন আঞ্চলিক কার্যালয় এরই অংশবিশেষ। এই ডিজাইন অনুসরণ করে আরও বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক কার্যালয় পুননির্মাণে কাজ করছে ব্র্যাক। এত কর্মী, এত প্রসার, অথচ তৃণমূল চিরায়ত স্থাপনার সংস্কৃতি অনুসরণ করেই ভবন নির্মাণ— এটিই প্রমাণ করে ব্র্যাক সবসময় মানুষের পাশে থাকতে চায়, যেকোনো সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় কাজ করতে চায় নিবিড়ভাবে। আমরা বিশ্বাস করি, আমরাও স্থাপত্যের মাধ্যমে এই আদর্শের খানিকটা প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছি। এটিই স্থাপত্যের স্বার্থকতা।