27/12/2016
গতকাল মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে মংডুর লুদাইং নামক গ্রামে বর্মি সেনারা রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি, দোকানপাটসহ বিভিন্ন ছোট বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। অপর দিকে সম্প্রতি সেনাবাহিনী প্রধান মিং অং লাই মংডু পরির্দশনের সময় সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে নাকফুরার দুস মোহাম্মদ (প্রকাশ সোনা মিঞা) নিজেদের ওপর নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরার অভিযোগে বর্মি সেনারা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
গতকাল রোববার সকালে ওই সব গ্রামে এসে এই নির্দেশ দেয় তারা। সাথে এটাও বলে যায় ‘আগামীকালের মধ্যে ওই দোকানপাট দেখলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হবে’। এ ছাড়াও নির্দেশ অমান্যকারীকে প্রাণে মারার হুমকিও দেয় বলে স্থানীয় রোহিঙ্গারা জানান। এতে নতুন করে আতঙ্কের মধ্যে রোহিঙ্গারা বর্মি সেনাদের এই নির্দেশ পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কয়েক দিন আগে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ওপারে মংডু থানাধীন শিলখালী গ্রামে রোহিঙ্গা মুসলিমের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয় দেশটির সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি)। এ ছাড়া স্থানীয় রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীদের বাজারের দোকানপাট ও পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে বিজিপি। গত সপ্তাহে সোমবার থেকে ওই শিলখালী গ্রামের প্রায় ২৫টি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিজিপি এই কৌশলে রোহিঙ্গাদের বাস্তুহারা করে অভিবাসী হিসেবে ক্যাম্পবন্দী করার পরিকল্পনাই নিয়েছে। মিয়ানমারের বর্মি বাহিনী রোহিঙ্গাদের গুলি করে হত্যা ও কারাবন্দীর হুমকি দিয়ে নিজ হাতে বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাঙতে বাধ্য করছে। অনেকেই নিজেদের বাড়িঘর ভাঙতে রাজি না হওয়ায় বিজিপির সদস্যরা সেগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
পালিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের জনশূন্য গ্রামগুলোতে ব্যাপক লুঠতরাজ চালাচ্ছে মগ বাসিন্দারা। ইতোমধ্যে গত শনিবার রোহিঙ্গাদের প্রাচীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গুঁড়িয়ে দিয়েছে মগ সন্ত্রাসীরা। এই মগ সন্ত্রাসীদের সহযোগিতায় মিয়ানমারের বর্মি বাহিনীর সদস্যরা শনিবার দক্ষিণাঞ্চল মংডুর নুরুল্লাহ গ্রামের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি গুঁড়িয়ে দেয়। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তারা বলেছেন, মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা গত শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীর ভাঙতে শুরু করেছে এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া ওই এলাকার আরো বেশ কিছু মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় ভবন ধ্বংসেরও হুমকি দিয়েছে তারা।
ম্যাগ্গি ক্যাম্পের বিজিপির কমান্ডার ও তার দল ৪০ জন শ্রমিককে ভাঙচুরের কাজে বাধ্য করে। এ সময় গ্রামের প্রশাসক ৩০ জনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছলে তাদেরও ভবন ধ্বংসের কাজে অংশ নিতে নির্দেশ দেয়া হয়। এটিকে বর্মি সেনাদের রোহিঙ্গাশূন্য করার নতুন কৌশল বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ রোহিঙ্গাদের অর্থবল কমিয়ে দিলে এমনিতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবে এই মনোভাব তাদের।
স্থানীয় রোহিঙ্গাদের দাবি বর্মি বাহিনী আরাকান রাজ্যের মংডু এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে কৌশলে বাস্তুহারা করে তাদের অভিবাসী হিসেবে ক্যাম্পবন্দী করার পলিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এর আগেও ২০১২ সালে আরাকান রাজ্যে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আকিয়াবে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে অভিবাসী হিসেবে ক্যাম্পবন্দী করে রাখে মিয়ানমার সরকার। গত ৯ অক্টোবর রাখাইনের নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার অভিযোগে অভিযান চালিয়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি বাড়িঘর ধ্বংস করেছে সেনাবাহিনী। ৫০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাস্তুহারা হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি উগ্রপন্থী মগেরাও রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে লুটপাট চালাছে।
এ দিকে গত ২০ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ অফিসারদের নিয়ে সফর করেছেন সে দেশের সেনাবাহিনী প্রধান মিং অং লাই। দলটিকে ৯ অক্টোবর থেকে চলমান রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর বর্বরতার কথা জানাতে গেলে রোহিঙ্গারা বাধার মুখে পড়েন। এর পরেও তাদের ভয়কে তোয়াক্কা না করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে নাকফুরার দুস মোহাম্মদ (প্রকাশ সোনা মিঞা) নামক এক যুবক নিজেদের ওপর নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরেন। কিন্তু তার পরের দিন থেকে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে গত শনিবার ওই গ্রামের নদীর পাড়ে গ্রামবাসীরা গলাকাটা অবস্থায় যুবকটির লাশ উদ্ধার কগ্রণ। তার দেহটি খুঁজে পাওয়া গেলেও এখনো মাথার অংশটি পাওয়া যায়নি। লাশে অমানবিক নির্যাতনের ক্ষত রয়েছে বলে রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন। এর কয়েক দিন আগেও পরিদর্শক দলের সাথে কথা বলায় অন্য এক যুবকে বর্মি সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করে।