08/09/2026
তপ্ত দুপুরে জেদ্দা-জাজান মহাসড়কের দিকে তাকালে মনে হয় মরুভূমির বুক চিরে আগুন ঝরছে। রমজানের সেই তপ্ত দিনে কফিলের সঙ্গে যাকাত বিতরণের উদ্দেশ্যে উপকূলীয় এক দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামের পথ ধরেছিলাম। সেই খাঁ খাঁ রোদে দূর থেকে দেখা গেল একা এক ছায়ামূর্তি—নড়বড়ে পায়ে কিন্তু অটল বিশ্বাসে হেঁটে চলেছেন সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। পরনে ধূলিমলিন পোশাক, ঠোঁট দুটো পিপাসায় শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু তার চোখেমুখে এমন এক অপার্থিব প্রশান্তি, যা কেবল কোনো পরম প্রেমিকের মুখেই মানায়।
এক নিঃস্ব আশিকের অবিচল পদযাত্রা
গাড়ি থামিয়ে কাছে গিয়ে সালাম দিতেই ক্লান্তিহীন এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। পরিচয় জানতে চাইলে বললেন, তিনি সুদূর যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন থেকে এসেছেন। গন্তব্য কোথায়? দ্বিধাহীন চিত্তে তিনি উত্তর দিলেন—পবিত্র বাইতুল্লাহ শরীফ, উমরাহ করতে যাচ্ছেন তিনি। আইনসম্মত পথ বাদ দিয়ে এই মৃত্যু উপত্যকায় কেন? বৃদ্ধের সরল জবাব, 'আমার কাছে তো দুই হাজার রিয়াল জামানত দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না বাবা। সম্বল ছিল মাত্র দুইশ রিয়াল। একশ রিয়াল ভাড়ায় শেষ, পকেটে পড়ে আছে শেষ একশটি রিয়াল। তাই বাকি পথটুকু পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছি।' টানা ছয় দিন ধরে এই মরুভূমিতে হাঁটছেন তিনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই তীব্র তাপদাহ আর দীর্ঘ ক্লান্তিকর সফরের মাঝেও তিনি সিয়ামরত!
রবের কুদরতে উন্মুক্ত রাজপথ
হতবাক হয়ে আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, 'এত শত চেকপয়েন্ট আপনি কীভাবে পার হলেন। কেউ আপনাকে আটকায়নি?' বৃদ্ধ বললেন, 'কসম সেই মহান রবের, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই! আমি প্রতিটি চেকপয়েন্টের সামনে দিয়েই হেঁটে গেছি, কিন্তু কেউ আমাকে আটকায়নি।' তিনি আরও বললেন, 'কিছুক্ষণ আগে একটা দল আমাকে ধরে থানায় নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন আমি বললাম আমার উদ্দেশ্য শুধু বাইতুল্লাহর জিয়ারত, তখন তারা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।' এ কথা শুনে রীতিমতো আমাদের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেল, আসলে যার অন্তরে বাইতুল্লাহর ভালোবাসা খাঁটি, তামাম পৃথিবীর কোনো সীমান্ত তাকে আটকে রাখতে পারে না।
অশ্রুজলে ভেজা আসমানি মদদ
বৃদ্ধের ঈমানি দৃঢ়তা দেখে কাফিলের চোখ ভিজে উঠল। তিনি যাকাতের দুটি খাম বৃদ্ধের কাঁপতে থাকা হাতে তুলে দিলেন। বৃদ্ধ বিনীতভাবে ধন্যবাদ জানালেন, কিন্তু তিনি জানতেন না সেখানে কী আছে। আমরা যখন বললাম, 'বাবা, খাম খুলে টাকাগুলো নিরাপদে গুছিয়ে রাখুন,' তখন খাম খুলে দশ হাজার রিয়াল দেখে বৃদ্ধ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। চরম বিস্ময় আর আবেগে তিনি গাড়ির সিটেই লুটিয়ে পড়লেন। দুচোখ বেয়ে শ্রাবণের মতো অশ্রু ঝরছিল, আর অস্ফুট স্বরে বলছিলেন, 'এসব কি সত্যিই আমার জন্য? এত বড় অঙ্ক সব আমার?' পানি ছিটিয়ে চেতনা ফেরানোর পর তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, 'ইয়েমেনে আমার একটা ছোট বাড়ি আছে। তার সঙ্গে একটা জমি ছিল যেটা আমি আল্লাহর নামে ওয়াকফ করে দিয়েছি। সেই জমিতে আমি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিলে মসজিদ তৈরি করেছি। ভবন তৈরি হয়ে গেছে, কিন্তু মেঝে আর কিছু জিনিস বাকি আছে। আমি এই চিন্তায় ছিলাম যে টাকা কোথা থেকে আসবে। আজ আল্লাহ আপনাদের মাধ্যমে আমাকে তা দান করেছেন।'
পাখির মতো রিজিক আর অনন্ত তাওয়াক্কুল
দৃশ্যটি দেখে আমরা আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। রাসূলুল্লাহর (ﷺ) সেই অমিয় বাণী যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল—যার উদ্দেশ্য হয় আখিরাত, আল্লাহ তার অন্তরে প্রাচুর্য দেন এবং দুনিয়া তার পায়ে এসে লুটিয়ে পড়ে। কাফিল সাহেব ব্যাকুল হয়ে আরও দুটি খাম তার হাতে গুঁজে দিলেন। সর্বমোট বিশ হাজার রিয়াল কোলে জড়িয়ে ধরে মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন সেই বৃদ্ধ। বারবার বলছিলেন, 'আল্লাহ আজ পাখির মতো আমাকে রিজিক পৌঁছে দিলেন।' ঠিক যেমনটি হাদিসে বলা হয়েছে—যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথার্থ তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি পাখিদের মতো তোমাদের রিজিক দিতেন; যারা সকালে শূন্য পেটে বের হয় আর সাঁঝের বেলা উদর পূর্ণ করে বাসায় ফেরে। মরুভূমির সেই অলৌকিক দুপুর সাক্ষী রইল, যে বান্দা সব ছেড়ে রবের ওপর ভরসা করে, মরুভূমির তপ্ত বালুকাও তার জন্য রহমতের বিছানা হয়ে যায়।
বি.দ্র: উক্ত ঘটনাটি সৌদি প্রবাসী এক ভাইয়ের সাথে ঘটা, যা আমরা ডা: আব্দুর রহমান নামে এক ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছি।
(সংগৃহীত)