06/14/2026
#গল্প #আমাদেরমা #মুস্তাকিমবিল্লাহ
আমার মা বোকা একজন মহিলা, জটিলতা বুঝে না। মায়ের মতো আমরা তিন ভাই বোন কেউ বোকা হইনি। আমার বড় ভাই ক্লাসে প্রথম হয়, আপাও ভাইয়ার মতো। আমি প্রথম হতে না পারলেও চার পাঁচ রোলের ভিতরে থাকি।
কখনো মানুষ হাসতে হাসতে বলে এই বোকা মহিলার ছেলেমেয়ে এতো বুদ্ধিমান কি করে হয়? মা শুধু হাসেন। আমার তখন খারাপ লাগে, হাসির কথা না এসব। মায়ের উচিত কথা শুনিয়ে দেওয়া যেনো ফের এসব বলবার সাহস না পায়। তবে মা শুধুই হাসেন।
মায়ের সাথে বাবার বিয়ের আটমাস পরেই সবাই চেয়েছে বাবাকে আবার বিয়ে করাতে, এমন বোকা মহিলা আমার বাবার মতো বুদ্ধিমান মানুষের সাথে যায় না। বাবা শিক্ষক মানুষ, এই শহরের সবাই বাবাকে সম্মান করে, তার বউ হবে বুদ্ধিমান কথার মারপেঁচে ফেলতে পারবে এদিকে আমার মা বোকা স্বভাবের। মায়ের এই বোকা স্বভাবের কারণে বাবা মাকে নিয়ে কোথাও কোনো অনুষ্ঠানে যেতেন না, যদিও বাবা মাকে ছাড়েনি। এই যে বিয়ের একুশ বছর হয় গেছে বাবা শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত একসাথে ছিলেন, আমরা তিন ভাই বোন মায়ের কোলজুড়ে এসেছি৷
গতরাতে আমার বাবা আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। মা গতকাল থেকে মুখে খাবার তুলেনি, যদিও বাড়িতে এখন উৎসব শুরু হয়ে গেছে, খাওয়া নিয়ে, আত্মীয় স্বজনদের ভিতরে খোশগল্প শুরু হয়েছে; সবকিছু দেখে মনে হলো এ যেনো এক মিলনমেলা। বাবার শোক বাড়িতে কিছু সময় ছিলো এখন সেসব নেই, শুধু মা ঘরের এক কোনায় বসে কাঁদছেন। মা কেন কাঁদছেন সে নিজেই জানেন, বাবা যে মাকে অনেক ভালোবাসতেন তেমনও না, বাবা যা করেছে মাকে অবহেলা কারণ মাকে নিয়ে সবার সামনে যাওয়া যেতো না। মায়ের আপন বলতে ছিলো ঘরের হাড়ি পাতিল, আর ছাদে আটকে রাখা কিছু মুরগী।
আমার সহজ সরল মা যেনো নতুন একটা দুনিয়ার সাথে পরিচয় হয়েছেন। বাড়িতে একটা পয়সাও নেই। মা যেহেতু সহজ সরল বাবা কখনো মায়ের কাছে টাকা পয়সা দিতেন না, হারিয়ে ফেলবে, বা কেউ নিয়ে যাবে এমন চিন্তা করতেন। মায়ের কাছে কিছু বলেও যায়নি, বাবা যদি জানতেন হুট করে এমন চলে যাবেন তবে হয়তো বলে যেতেন তার টাকা পয়সা কোথায় রাখা।
আমি এবার ক্লাস সেভেনে পড়ি, বড় আপা ক্লাস টেনে, ভাইয়া কেবল কলেজে ভর্তি হয়েছে। ঘরে যা বাজার আছে বড়জোর এক সপ্তাহ চলে যাবে তারপর কি খাবো তার কোনো ঠিক নেই।
আপা আর আমি এক প্লেট ভাত নিয়ে মায়ের কাছে বসি, মা চোখ মুছতে মুছতে বলেন আমার ক্ষুধা নেই। ক্ষুধা নেই, সে কেমন কথা? গতরাত থেকে মা কিছু খায়নি। আপা আর আমি চুপচাপ বসে আছি, ভাইয়া বাহির থেকে ঘরের ভিতরে আসেন। আপা ভাইয়ার হাত ধরে বলে, দেখ না জহির মা কিছু খাইতে চাইছে না।
ভাইয়া মায়ের পাশে বসে, মা ভাইয়াকে একটু বেশিই স্নেহ করেন। ভাইয়ার যখন তিন বছর বয়স তখন তার ভয়ংকর এক জ্বর হয়, সবাই ভেবেছিলো বাঁচানো যাবে না। মা কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে গেলেন, ভোরে দেখলেন ভাইয়ার জ্বর কমে গেছে, সুস্থ হয়ে উঠে। ঠিক এই কারণেই ভাইয়ার প্রতি মায়ের আলাদা একটু টান।
আপার হাত থেকে জহির ভাইয়া প্লেট নিয়ে মায়ের মুখে ভাত তুলে দেয়, মায়ের দুই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে নামছে। মা প্লেটের অর্ধেক ভাত খায়, বাকিটা আর খাওয়াতে পারেনি।
বাড়িতে আসা আত্মীয়রা দুদিনের ভিতরেই চলে যেতে শুরু করে। বাড়িটা খালি হতে শুরু করে, উৎসবের আয়োজন কমে যেতে শুরু করে।
আপার ফর্ম ফিলাপের তারিখ দেয়, মায়ের কাছে এসে বলে। মা এখন টাকা পাবে কোথায়? বাবার টাকার কোনো খোঁজ সে জানে না। মা ছোটো চাচার কাছে ছুটে যায়। সেদিন রাতে বাবা নাকি কথা কথায বলেছে, ছোটো চাচার কাছে তার পয়তাল্লিশ হাজার টাকা রাখা আছে৷
মা যখন চাচার কাছে টাকার কথা বলে, ছোটো চাচা বলে তার কাছে কোনো টাকা রাখেনি। মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, জহিরের বাবা আমার কাছে বলেছেন আপনারে সে টাকা দিছে। ছোটো চাচা বলে, এমন কোনো টাকা দেয়নি।
মা চোখে পানি নিয়েই ফিরে আসেন। মায়ের কথার এই পরিবারে কোনো মূল্য নেই, মা বোকা মানুষ, তার যা মনে আসে বলে যায়, ছোটো চাচার কথাই সবাই মেনে নিয়েছে। মা সেদিন ঘরে এসে আমাদের তিন ভাই বোনকে সামনে বসিয়ে বলে, তোদের কি মনে হয় আমি মিথ্যা বলেছি? জহির ভাইয়া বলে, মা এখন চাচা স্বীকার না করলে কি করবার। মা বলেন, তোর বাবা সত্যি আমাকে এই টাকার কথা বলেছেন। মা বিলাপ করতে থাকেন, একসময় নিজেই চোখ মুছে স্বাভাবিক হয়।
আমার বোকা মাকে এরপর চুপচাপ হয়ে যেতে দেখি, মাকে বহুদিন হয় হাসতে দেখি না। বাবা টাকা যাদের কাছে রেখেছেন সবাই কেমন করে চেপে গেলেন, আমাদের আত্মীয় স্বজনরা দূরত্ব বাড়িয়ে দিলেন। এখন কেউ আমাদের ফোনে কল দেয় না, যদি মা কারো কাছে টাকা চেয়ে বসে সেই ভয়ে। অভাবী মানুষের থেকে তার আত্মীয় স্বজনরা দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়, লুকিয়ে থাকে, না জানি কখনো টাকা চেয়ে বসে সেই ভয়ে।
সেদিন সন্ধ্যা বেলা উচ্চস্বরে হাসির শব্দ শুনতে পাই। আমি আর আপা ছাদে ছুটে যেয়ে দেখি মা খিলখিল করে হাসছেন। আমার ভয় লাগে, সন্ধ্যাবেলা নাকি মানুষকে ভুতে ধরে, মা কোনো কারণ ছাড়া একা একা হাসছেন তবে কি মাকে ভুতে ধরেছে? আমি আপার হাত ধরে পিছনে এসে দাঁড়াই। আপা মায়ের গায়ে হাত দিয়ে বলে, মা হাসছো কেন? মা বলে, একটা খুশির খবর পেয়েই হাসছি। খুশির খবর? আমাদের জীবনেও খুশির খবর আছে তাহলে?
মা বলেন, তোর ছোটো চাচার এক ট্রলার মালামাল নদীতে ডুবে গেছে, ট্রলার তুলতে পারলেও মাল তুলতে পারিনি। প্রায় এক লাখ টাকার মালামাল ছিলো। উপরে একজন আছেন তিনিই সবকিছুর বিচার করেন, আমি শুধু অপেক্ষায় ছিলাম তবে এতো তাড়াতাড়ি সবকিছু দেখতে পারবো চিন্তা করিনি৷
ছোটো চাচা পরদিনই আমাদের বাসায় আসেন, মা সামনের ঘরে বসে চাচার সাথে কথা বলছেন। আমরা তিন ভাই বোন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা শুনছি। চাচা মায়ের হাতে পনেরো হাজার টাকা দিয়ে বলে, ভাবি ভাইজান আমার কাছে কিছু টাকা দিয়েছিলো, এখন এই টাকাটা রাখেন বাকি টাকা সামনের মাসে দিয়ে দিবো।
মা জহির ভাইয়াকে বাজারে পাঠায়। কয়েকদিন বাসায় শুধু আলু আর ডাল রান্না হয়েছে, বড় মামা এসে কিছু বাজার করে দিয়ে গেছেন সেসবেই চলছে খাবার। ভাইয়ার সাথে আমিও বাজারে যাই।
পরদিনই মা আপার ফর্ম ফিলাপের টাকা দিয়ে দেন। আমার বোকাসোকা মা এখন আমাদের পড়াশোনার খোঁজ খবর রাখেন, মা ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছেন এরপর স্কুলে যাওয়া হয়নি। তবে আমাদের তিন ভাই বোনের পড়ার টেবিলের পাশে গভীর রাত পর্যন্ত চুপচাপ বসে থাকেন।
কিছুদিন পরেই মায়ের কাছে একজন লোক দেখা করতে আসে, নদীর ওইপাড়ে বাড়ি। আমার বাবার এক বন্ধু, দুইবার আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, সে অনেক বছর আগে।
তিনি অনেক আপসোস করলেন বাবার মৃত্যুর খবর পায়নি তাই, ফুপিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। যাবার সময় মাকে বলেন, ভাবি জহিরের বাবার তিন লাখ টাকা আমার কাছে আছে, দুই বন্ধু একটা ব্যবসা শুরু করছিলাম। এখন বুঝতে পারছি আপনাদের পরিবারের অবস্থা, আপনি যদি বলেন আমি টাকাটা দিয়ে যাবো, সম্পূর্ণ টাকাটা একসাথে দিতে পারবো না, অল্প অল্প দিতে পারবো, জহিরকে আমার কাছে পাঠালেই হবে।
বাবার যে বিশ্বাস ছিলো সেই বিশ্বাস তার বন্ধু রেখেছেন। জহির ভাইয়াকে মা মাসে মাসে নদীর ওইপাড়ে বাবার বন্ধুর কাছে পাঠায়, ভাইয়ার কাছে টাকা দিয়ে দেয়।
বোকাসোকা মা কেমন গুছিয়ে একটা সংসার সামলান। মা কখনো ঠিকমতো ঘরের বাজারের লিস্ট করতে পারতেন না, এইজন্যে বাবা মাঝেমধ্যে রাগা করতেন। এখন মা গুছিয়ে একটা সংসার সামলে নেন, তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, সংসারের কোথায় কি খরচ করতে হয় সব হিসাব ঠিকঠাক করেন।
ভাইয়া শহরে ভর্তি হওয়ার পরে বাবার বন্ধু হাসনাত চাচার কাছে টাকা নিতে আমিই যেতাম। মা পুরো টাকাটা নেয়নি, বুদ্ধি করে বলেন ব্যবসার ভাগ থাকুক মাসে মাসে টাকা দিলেই হবে। চাচা বলে তাহলে আমারও উপকার হবে ভাবি, আপনি চিন্তা করবেন না, উপরে আল্লাহ আছেন আমারে বিশ্বাস করেন আমি আপনাদের কখনো ঠকাবো না। মা হেসে বলেন, ভাইজান এখন আল্লাহর উপর ভরসা করেই চলতে হয়।
জহির ভাইয়া ভার্সিটি থেকে পাশ করবার পরে আমাদের মফস্বল শহরেই কলেজে চাকরি নেয়। বড় আপাও একটা প্রাইমারী স্কুলে চাকরি করে, আমাদের পাশের গ্রামেই আপার বিয়ে হয়। আমি একটা কোচিং সেন্টারে পড়াই, ঠিক করেছি নিজেই একটা কোচিং সেন্টার দিবো। জহির ভাইয়া কিছু টাকা দিয়েছেন, আমার অল্প কিছু টাকা ছিলো সেই টাকায়ই একটা কোচিং সেন্টার চালু করি। এখন পঁচাত্তরজন স্টুডেন্ট আছে।
মাকে কেউ এখন বোকা বলে তেমন অপমান করবার সাহস পায় না। আমার মা মফস্বল শহরের এমন একজন সাধারণ মহিলা যিনি তার তিন সন্তানকে সুশিক্ষিত করেছেন, মাকে নিয়ে এখন মানুষ প্রয়ই গর্ব করে কথা বলে। আমার মা বোকা না, বুদ্ধিমান, আমার মা সাধারণ হয়েই অসাধারণ একজন মহিলা।
হাসনাত চাচার কাছে সেবার টাকা নিতে যাই। সিঁড়ি থেকে উঠতে যাবো তখনই একটা মেয়ের সাথে দেখা হয়, মেয়েটা হেসে বলে আপনার নাম, জাহিদ? আমি বলি হ্যাঁ। মেয়েটা হেসে বলে আমার নাম প্রিয়তি। আপনার হাসনাত চাচার ছোটো মেয়ে। মেয়েটা হাসি দিয়ে নিচে চলে যায়।
এরপর যতবার চাচার কাছে গেছি তখনই দেখতাম প্রিয়তা আমার পাশে ঘুরঘুর করে। একদিন চায়ের কাপের সাথে একটা চিঠি পাই। অল্প কয়েকটা লাইন,
‘জাহিদ ভাই, আপনাকে আমার ভালো লাগে। আমি আপনাকে নিজ থেকে চিঠি লিখিছি বলে আমাকে নিচু মনের ভাববেন না দয়া করে। আমি অনেক চিঠি পাই, তবে কখনো কাউকে চিঠি লেখা হয়নি। তবে আপনাকে চিঠি লিখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। চিঠির শেষ আমার ফোন নাম্বার দিয়ে দিলাম। নাম্বারটা মায়ের বিকাল পাঁচটার পরে কল দিলে আমারে পাবেন। কল দিবেন কিন্তু।’
আমাকে কোনো মেয়ে চিঠি লিখতে পারে ধারণায় ছিলো না। প্রিয়তির চিঠি পেয়ে অন্যরকম এক অনুভূতি শুরু হয় বুকের ভিতরে। মেয়েটার প্রতি বুকের ভিতরে একটা জায়গা তৈরি হয়। যখন মাসে একবার এই বাড়িতে আসি প্রিয়তিকে দেখি দু-চোখ ভরে।
প্রিয়তি কলেজ থেকে পাশ করবার পরে শহরে ভর্তি হয়। ওর হল থেকে মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বাহিরে বের হওয়ার অনুমতি ছিলো। একমাস পরে বৃহস্পতিবার বিকালে আমাদের দেখা হতো৷
আমার কোচিং সেন্টার তখন বেশ ভালোই চলছে। মা হাসনাত চাচার কাছে প্রিয়তি আর আমার বিয়ের কথাটা বলে। প্রিয়তি আর আমার বিয়ে হয় ঠিক এক বৃহস্পতিবার রাতে। প্রিয়তির মা নেই, আমার মাকে দেখি মেয়েটাকে গভীর মমতায় রাখে। আমার মা শূন্য থেকে আমাদের জীবনের সব স্বপ্ন পূর্ণ করে দিয়েছেন। আমার মা যে অসম্ভব বুদ্ধিমান একজন মহিলা সে আমরাই জানি, খারাপ সময়গুলো আমাদের খুব যত্ন করে আগলে রেখেছেন যেমন ঝড়ের সময় আমাদের বাচ্চাওয়ালা মুরগীটা তার পালকের ভিতরে আগলে রাখে বাচ্চাদের৷
আমাদের মা
-মুস্তাকিম বিল্লাহ
[আপনার গল্পটি খুব ভালো লাগলো তাই শেয়ার করে নিলাম।]