30/05/2026
ভাতঘুম বদ অভ্যাস নয়, এর দারুণ সব উপকারিতা রয়েছে :
বাংলাদেশে অনেকেই দুপুরের খাওয়ার পর কিছুটা ঘুমিয়ে নেন। যাকে বাংলায় বলা হয় ভাত-ঘুম। দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমানোকে যদিও অনেক সময় আলসেমি মনে করা হয়, কিন্তু দশ থেকে কুড়ি মিনিটের ভাত-ঘুমের অনেক উপকারিতা রয়েছে। এরপক্ষে এখন অনেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদিও রয়েছে। সব বয়সের জন্যই ভাত ঘুম উপকারি।
নতুন এক গবেষণা বলছে, এটি হয়তো আপনাকে আরো বেশি দিনবাঁচতে সাহায্য করবে।
ভাত-ঘুমেরসংস্কৃতি
ভাত-ঘুম শুধু বাঙালির অভ্যাস নয়, এ সংস্কৃতি রয়েছে বিশ্বের অনেক দেশেও। ইউরোপের অনেক ভাষায় ভাত-ঘুমকে বলা হয়‘সিয়েস্তা’। আর ইংরেজিতে বলা হয়‘পাওয়ারন্যাপ’।
ইউরোপের যে দেশগুলোতে খানিকটা গরম আবহাওয়া রয়েছে, যেমন গ্রীস ও স্পেনে সেসব দেশে ভাত-ঘুম সিয়েস্তা নামে পরিচিত।
বলা হয় দুপুর ২টার পরে এই দেশগুলো নাকি ঝিমিয়ে পড়ে। ইউরোপের কিছু শহরে এমনকি সেখানকার মানুষের সিয়েস্তার আইনি অধিকারও রয়েছে।
রিফ্রেশবাটন:
দিনভর নানা কাজের চাপের মাঝে কম্পিউটারের‘রিফ্রেশ বাটনের’মতো কাজ করে ভাত-ঘুম। দুপুরের পর দিনের বাকি সময়টুকু সতেজ বোধ করা এবং মনমেজাজ ভালোরা খতেভাত-ঘুম বেশ কাজে আসে।
যেধরনের কর্মশক্তি নিয়ে দিন শুরু হয় সেটি দিন গড়ানোর সাথে সাথে কমে আসতে শুরু করে। ন্যাপ বা ভাত-ঘুম শরীরের কর্মশক্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তাকরে,বলছেন লন্ডনের ঘুমবিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠান “দ্যা স্লিপ স্কুলে “ প্রতিষ্ঠাতাদেরএকজন,ঘুমবিশেষজ্ঞ গাইমেডোজ।
আমরা যখন ঘুম থেকে উঠি্:
আমাদের মস্তিষ্কে এডেনোসিন নামে একটি রাসায়নিকের ক্ষরণ বাড়তে থাকে। আমরা যত বেশি সময় ধরে জেগে থাকি, আমাদের মস্তিষ্কে এর উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে এবং শরীরে ঘুম-ভাব তৈরি হতে থাকে।
গাইমেডোজ বলছেন:
‘যখন আমরা ন্যাপ নেই তখন এডেনোসিনের ব্যবহার কমে আসে, এটি সংরক্ষিত হয়। যার ফলে কর্মশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং আমরা সতেজ অনুভব করি,মেজাজ ভালো বোধ করি।’
এর ফলে বিকেলের দিকে কাজে মনোযোগ বেশি দেয়া সম্ভব হয় এবং কাজে ভুল করার সম্ভাবনা কমে। তার মতে, ভাত-ঘুমের সময়কাল হওয়া উচিৎ ১০থেকে২০ মিনিট।
ভাত-ঘুম উচ্চ রক্ত চাপ কমাতে সাহায্য করে:
তার মানে হৃদপিণ্ড ও কিডনির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। আর শরীরের এইযন্ত্রগুলো ভালো থাকলে আরো অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ থাকবে।
যদি আমরা মস্তিষ্কের স্মরণশক্তি, সৃজনশীলতা, কোনো কিছু বোঝার ক্ষমতা বাড়াতে চাই তাহলে ৯০মিনিট পর্যন্ত ন্যাপ করা যেতে পারে। ’
মনের উপরে প্রভাব:
ঢাকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা.ইশরাত শারমিন রহমান বলছেন, শরীরে মন ভালো রাখার যে হরমোনগুলো রয়েছে ঘুম সেগুলোর ভারসাম্য তৈরি করে ঘুম। বেশি সময় জেগে থাকলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়। ঘুমালে হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা হয়, চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন কম ক্ষরণ হয়। মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায়। তাতে মনের চাপ, উদ্বেগ দূর হয়, মুড ভালো থাকে, চিন্তার প্রক্রিয়া ভালো কাজ করে।’
যেভাবে উৎকৃষ্ট ভাত-ঘুম নিতে পারেন:
কেউ কেউ আছেন কোথাও গা এলিয়ে দিলেই ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু সবাই তা পারেন না। আর কাজে থাকা অবস্থায় চেয়ার, টেবিল, সোফায়, আশপাশে মানুষের উপস্থিতি ও কথাবার্তার মধ্যে সবাই সবসময় ভাত-ঘুম আরাম করে দিতে পারেন না। কিন্তু চারপাশে পরিবেশে হালকা পরিবর্তন এনে উৎকৃষ্ট ভাত-ঘুম নেয়া সম্ভব।
দিনের মাঝামাঝি সময়ে যেহেতু ৯০মিনিটের ভাত-ঘুম দেয়া মুশকিল তাই১০ থেকে২০মিনিটকে ভাত-ঘুমের জন্য আদর্শ মনে করা হয়। ড. মেডোজ বলছেন, ন্যাপ হচ্ছে সাঁতার কাটা বা বাইসাইকেল চালানোর মত।
অনুশীলনের মাধ্যমে আরো ভালো হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শরীরকে ভাত-ঘুমে অভ্যস্ত করেতোলা যায়।
ড. মেডোজ বলেন, ‘যদি ভাত-ঘুম দিতে চান তাহলে শুরুতেই ঘড়িতেঅ্যালার্মদিয়েনিন, যাতে কাজের মধ্যে বেশিক্ষণ ঘুমিয়ে না থাকেন। প্রতিদিন সময় না বদলে ঠিক একই সময় ন্যাপ নেয়ার চেষ্টা করুন।
•
• ভাত-ঘুম নিতে চাইলে দিনের এই সময়টা আসার আগে চা-কফি নয়:
• সময়ের মিনিট পাঁচেক আগে কাজ বন্ধ করুন, উদ্দীপনা তৈরি করে এমন কিছু থেকে সরেআসুন, অথবা সরিয়ি রাখুন। মোবাইলফোন, ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিন।
•
• ঘরের আলো কমিয়ে দিন এবং শব্দের উৎসনি য়ন্ত্রণ করুন:
• একটুখানি পানি পান করুন। যদি চোখ ঢাকার মতো কিছু থাকে সেটি দিয়ে চোখ ঢাকুন, স্থির থাকুন, দীর্ঘ নিশ্বাস নিন। সোজা কথায় শরীর ও মনকে শিথিল করুন। চোখ বুজে মন থেকে নেতিবাচক, উদ্বেগ সৃষ্টি করে এমন চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এতে ঘুম আসে। তবে সবার ক্ষেত্রে সবসময়ে কাজে নাও লাগতে পারে।
যেভাবেভাত-ঘুম নয়:
২০থেকে৯০মিনিটেরবেশি সময় ধরে ভাত-ঘুম নেয়া যাবে না। সেটাকে আর ভাত-ঘুম বলাও যাবেনা। সেক্ষেত্রে সেটা হবে গভীর ঘুম।
অনেকেই দুপুরের পর বেশি সময় ঘুমিয়ে ওঠার পর শরীরে একধরনের অনুভূতির কথা বলেন যাকে কথ্যভাষায় বলে শরীর‘ম্যাজম্যাজ’করা। এ ধরণের অনুভূতির কারণ হলে “শরীরে গভীর ঘুমের বোধ চলে এসেছে কিন্তু পুরো ঘুম হয়নি “
আর একটি কথা মনে রাখতে হবে। যারা রাতে ভালো ঘুমিয়েছেন এবং যারা ভালো ঘুমাতে পারেননি তাদের সবার ক্ষেত্রেই ভাত-ঘুম কাজে দেয়।